
ক্যালসিয়াম (Ca)
“চোখের সামনেই লুকায়িত ধাতু — তোমার হাড়, ডিমের খোসা, ব্ল্যাকবোর্ডের চক আর পদ্মা সেতুর কংক্রিট, সবই দাঁড়িয়ে ভূত্বক্ষের এই পঞ্চম সর্বাধিক মৌলের ওপর।”
ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো
আউফবাউ নীতি থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবের পরিচিত ব্যতিক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়।
নোটগুলো
বৈশিষ্ট্য
- ইলেকট্রন বিন্যাস [Ar] 4s² — দুটি যোজ্যতা ইলেকট্রন এত সহজে ছাড়ে যে ক্যালসিয়ামের প্রায় সব রসায়নই আসলে Ca²⁺ আয়নের রসায়ন।
- ভূত্বক্ষের পঞ্চম সর্বাধিক প্রাপ্ত মৌল: চুনাপাথর, মার্বেল আর চক সবই ক্যালসিয়াম কার্বনেট () — কোটি কোটি বছর ধরে প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীর খোসা জমে জমে গড়া স্তর।
- পটাশিয়ামের চেয়ে অনেক শান্তভাবে পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে — ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইডে রূপ নিতে নিতে হাইড্রোজেনের বুদবুদ ধারাবাহিকভাবে উঠতে থাকে, আর সেই দ্রবণই গবেষণাগারের "লাইম ওয়াটার"।
- এর যৌগগুলো শিখাকে ইটের মতো লাল (খয়েরি-কমলা) করে তোলে — ক্যালসিয়ামের চিরাচরিত ফ্লেম টেস্ট; আর দ্রবীভূত Ca²⁺-ই পানিকে "খর" করে তোলে।
রুপালি-সাদা, বেশ নরম ধাতু — খোলা বাতাসে কয়েক মিনিটেই ধূসর প্রলেপে মলিন হয়ে যায়। গবেষণাগারে এটি বদ্ধ বোতলে কুচি বা ফিতার মতো আসে, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে খাঁটি ধাতুটির সঙ্গে দেখা প্রায় হয়ই না — চক, মার্বেল বা চুনাপাথরের মতো যৌগ হয়েই ক্যালসিয়াম ঘোরে।
কোথায় দেখা মেলে
✦ ব্যবহার
- সিমেন্ট ও কংক্রিট — চুনাপাথর পুড়িয়ে বানানো ক্লিংকারই গ্রামের পিলার থেকে পদ্মা সেতু পর্যন্ত সব স্থাপনার আঠা, আর চুনের গাঁথুনিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী সাজছে বাঙালির ঘর।
- হাড় ও দাঁতের সুস্থতা — হাইড্রক্সিঅ্যাপাটাইট নামের ক্যালসিয়াম ফসফেটই কঙ্কালের খনিজ; দুধ, কাঁটাসহ খাওয়া ছোট মাছ (মলা-ঢেলা), ডিমের খোসা আর ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট সেই মজুত পূরণ করে।
- প্লাস্টার অব প্যারিস ও জিপসাম বোর্ড — ক্যালসিয়াম সালফেট হেমিহাইড্রেট (·½) জমাট বেঁধেই হাড় ভাঙা জোড়া লাগানোর প্লাস্টার আর আধুনিক দালানের সিলিং-প্যানেল।
- বস্তার চুন [] উৎসবের আগে গ্রামের দেয়াল সাদা করে আর আম্লিক ক্ষেতের মাটি ঠিক করে; সেই চুন থেকেই বানে পানি জীবাণুমুক্ত করার ব্লিচিং পাউডার।
◍ দৈনন্দিন উদাহরণ
- ডিমের খোসা, শামুকের খোল আর ঝিনুকের খোসা প্রায় খাঁটি — একটার ওপর ভিনেগার ফেললে দেখবে -এর ফিনফিন বুদবুদ উঠছে।
- ব্ল্যাকবোর্ডের চক চাপা হয়ে থাকা ক্যালসিয়াম কার্বনেট, আর বুক-জ্বালা মেটানোর অ্যান্টাসিড ট্যাবলেটও তাই-ই।
- দুধ-দই, কাঁটাসহ খাওয়া ছোট মাছ আর শাকপাতা — বাঙালি থালার রোজকার ক্যালসিয়ামের উৎস এগুলোই।
ইতিহাস ও নাম
চুনাপাথর পুড়িয়ে পাওয়া সাদা গুঁড়ো চুন যুগ যুগ ধরে ঘর গাঁথছে আর পিরামিড তুলেছে, কিন্তু এটি আসলে কী — তা রসায়নবিদদের কাছে রহস্যই ছিল। ১৭৮৯ সালে আঁতোয়ান লাভোয়াজিয়ে চুনকে তাঁর নতুন "মৃৎ" পদার্থের তালিকায় রাখেন এবং সন্দেহ করেন যে প্রতিটি মৃত্বক্ পদার্থের ভেতরে একেকটি ধাতু লুকিয়ে আছে — অনুমানটি সঠিক প্রমাণিত হলো। ১৮০৮ সালে পটাশিয়াম-সাফল্যের উত্তেজনা নিয়েই হামফ্রি ডেভি চুন ও পারদ-অক্সাইডের পেস্টের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ চালনা করে ক্যাথোডে জমা পেলেন ক্যালসিয়াম-পারদ অ্যামালগাম, তারপর পারদ উবিয়ে বের করে সামনে আনলেন ঝকঝকে ক্যালসিয়াম ধাতু। মৌলটির নাম এলো লাতিন calx অর্থাৎ চুন থেকে।
কাছাকাছি মৌল
সারণিতে এই মৌলের ঠিক পাশে বসে থাকা মৌলগুলো — প্রায়ই রসায়নে সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
