
জিঙ্ক (Zn)
“বাংলাদেশের টিনের চালের দেহরক্ষক — বর্ষার মরচে থেকে ইস্পাত বাঁচায় জিঙ্কের প্রলেপ, টর্চের ব্যাটারির প্রাণও এটি।”
ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো
আউফবাউ নীতি থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবের পরিচিত ব্যতিক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়।
নোটগুলো
বৈশিষ্ট্য
- ইলেকট্রন বিন্যাস [Ar] 3d¹⁰ 4s²: দুটি যোজ্যতা ইলেকট্রন এত সহজে ছাড়ে যে জিঙ্ক প্রায় সবসময় Zn²⁺ আয়ন গঠন করে আর জারণ অবস্থা থাকে +২।
- এর অক্সাইড ও হাইড্রক্সাইড উভধর্মী — অ্যাসিডেও বিশ্লেষিত হয়, ক্ষারেও; এই ধর্মই জিঙ্ককে সাধারণ ক্ষারীয় অক্সাইডের ধাতু থেকে আলাদা করে।
- লঘু হাইড্রোক্লোরিক বা সালফিউরিক অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন ছাড়ে — পাঠ্যবইয়ের বিখ্যাত বিক্রিয়া Zn + → + , যাতে টেস্টটিউব ভরে ওঠে বুদবুদে।
- অন্য বেশিরভাগ ধাতুর তুলনায় অনেক কম ৯০৭ °C-তেই ফুটে যায়; এই কম স্ফুটাঙ্কের সুবাধেই পাতন করে জিঙ্ক শোধন করা যায়।
- সক্রিয়তা ধারাবাহিকে লোহার উপরে থাকে, তাই জিঙ্কের আস্তরণ নিজেই আগে ক্ষয় হয়ে নিচের ইস্পাতকে বাঁচায় — গ্যালভানাইজিংয়ের মূলনীতি এটাই।
নীলাভ-রুপালি মাঝারি সক্রিয় ধাতু — টাটকা কাটলে ঝকঝকে ধাতব দ্যুতি ফুটে ওঠে। কক্ষ তাপমাত্রায় ভঙ্গুর, ভাঙা গড়নে চিকচিকে স্ফটিকের দানা দেখা যায়; তবে ১০০–১৫০ °C-তে নরম হয়ে পাতে গড়ানো যায়।
কোথায় দেখা মেলে
✦ ব্যবহার
- গ্যালভানাইজিং — ইস্পাতের পাত গলিত জিঙ্কে ডুবিয়ে মরচে-প্রতিরোধী করা হয়; বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ঘরের ঢেউতোলা “টিনের চাল” আসলে গ্যালভানাইজড ইস্পাত।
- জিঙ্ক-কার্বন ড্রাই সেলের খোল ও ঋণাত্মক তড়িৎদ্বার — টর্চ, দেয়াল ঘড়ি কিংবা টিভির রিমোটের AA ব্যাটারির ভেতরের ঋণাত্মক তড়িৎদ্বারটিই জিঙ্কের খোল।
- পিতল — তামার সঙ্গে ২০–৪৫% জিঙ্কের সংকর — পানির কল, গোলাবারুদের খোল, বাদ্যযন্ত্র ও সাজসজ্জার ফিটিংসে ব্যবহৃত হয়।
- ক্যালামাইন লোশন, সানস্ক্রিন ও শিশুদের ক্রিমে জিঙ্ক অক্সাইড — র্যাশ কমায়, অতিবেগুনি রশ্মিও আটকায়।
- মানবদেহের শত শত উৎসেচকের কাজে লাগা অনুমাত্রিক পুষ্টি — বাড়ন্ত শিশুর খাদ্যে ও স্যাচেট ওষুধে জিঙ্ক যোগ করা হয়।
◍ দৈনন্দিন উদাহরণ
- গ্রামের ঘর বা শহরের চালাঘরের ঢেউতোলা চাল — তার রুপালি ফুলকানি স্ফটিকগুলোই মরচে ঠেকিয়ে রাখা জিঙ্কের প্রলেপ।
- টর্চ বা দেয়াল-ঘড়ির প্রতিটি ড্রাই সেল ব্যাটারির ভেতরে ঋণাত্মক তড়িৎদ্বার হিসেবে থাকে জিঙ্কের খোল।
- মাছ, ডাল, বাদাম ও দুধ — সাধারণ বাঙালি খাদ্যই প্রতিদিন শরীরের প্রয়োজনীয় কয়েক মিলিগ্রাম জিঙ্ক চুপিচুপি জোগায়।
ইতিহাস ও নাম
খ্রিস্টীয় নবম শতকের দিকেই রাজস্থানের জাওয়ার অঞ্চলের ভারতীয় ধাতুশিল্পীরা আকরিকা থেকে পাতন করে খাঁটি জিঙ্ক বানাতে পারতেন — প্রাচীন পৃথিবীতে এই কারিগরি ছিল কেবল তাঁদেরই হাতে। ইউরোপ এগিয়ে আসে ১৭৪০-এর দশকে: ইংল্যান্ডে উইলিয়াম চ্যাম্পিয়ন জিঙ্ক নিষ্কাশনের চুল্লির পেটেন্ট নেন, আর ১৭৪৬ সালে আন্দ্রেয়াস মার্গগ্রাফ ক্যালামাইন আকরিকা পাতন করে প্রমাণ করেন জিঙ্ক তামার ভেতরের কোনো খাদ নয়, স্বতন্ত্র এক ধাতু। “জিঙ্ক” নামটি এর আগেই ব্যবহার করেছিলেন অ্যালকেমিস্ট প্যারাসেলসাস — জার্মান Zinke বা “ধারালো ফলা” থেকে, চুল্লির দেয়ালে জমে ওঠা কাঁটাওয়ালা স্ফটিকগুলোর দেখনেই।
কাছাকাছি মৌল
সারণিতে এই মৌলের ঠিক পাশে বসে থাকা মৌলগুলো — প্রায়ই রসায়নে সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
