
আর্সেনিক (As)
“ইতিহাসের প্রিয় বিষ — স্বাদহীন, গন্ধহীন, নির্মম — আর আজ বাংলাদেশের লাখ লাখ নলকূপের ভেতরে নিঃশব্দ হুমকি।”
ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো
আউফবাউ নীতি থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবের পরিচিত ব্যতিক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়।
নোটগুলো
বৈশিষ্ট্য
- গ্রুপ ১৫-এর উপধাতু — পর্যায় ৪, p-ব্লক, ইলেকট্রন বিন্যাস [Ar] 3d¹⁰ 4s² 4p³, পাঁচটি যোজ্যতা ইলেকট্রন — রসায়নে দাঁড়িয়ে থাকে ওপরের ফসফরাস আর নিচের অ্যান্টিমনির ঠিক মাঝপথে।
- খোলা পাত্রে জোরে গরম করলে ধূসর আর্সেনিক গলে না — প্রায় ৬১৫ °সে-তে সরাসরি ঊর্ধ্বপাতিত হয়ে রসুন-গন্ধা বাষ্পে পরিণত হয়, যা জমাট বেঁধে আয়নার মতো ঝকঝকে কালচে পাতর হয়।
- ধীর কোষ-ঘাতক: আর্সেনিক আয়ন ATP বানানোর এনজাইমগুলোকে অকেজো করে কোষের শক্তির জোগান বন্ধ করে; দীর্ঘদিনের অল্প মাত্রাও আর্সেনিকোসিসের চামড়ার দাগ ও ক্যান্সার ডেকে আনে।
- পানিতে সম্পূর্ণ ছদ্মবেশি — বর্ণহীন, স্বাদহীন, গন্ধহীন — তাই দূষিত নলকূপ শুধু রাসায়নিক পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে; বাংলাদেশের খাবার পানির নিরাপদ সীমা প্রতি বিলিয়ন ভাগে ৫০ ভাগ।
- তিনটি অ্যালোট্রোপ — ধূসর, কালো আর নরম হলুদ রূপ — গ্রুপের ওপরের প্রতিবেশী ফসফরাসের মতোই রূপ-বদলানো স্বভাব এর।
সাধারণ ধূসর রূপটি ভঙ্গুর, ইস্পাত-দীপ্ত উপধাতু — কাচের মতোই ভেঙে যায়; একটি হলুদ অ্যালোট্রোপিক রূপও আছে, নরম-মোমাভ ও রসুন-গন্ধা, যা আলো লাগলেই ভেঙে ধূসর হয়ে যায়। পানিতে সে সম্পূর্ণ অদৃশ্য — আর এই অদৃশ্যতাই তাকে এত ভয়ংকর করেছে।
কোথায় দেখা মেলে
✦ ব্যবহার
- গ্যালিয়াম আর্সেনাইড (GaAs) চিপ: স্মার্টফোন যে শক্তিশালী রেডিও-সংকেতে কয়েক কিলোমিটার দূরের টাওয়ারকে ডাক দেয়, সেই প্রশস্তকারী চিপের গতি দেয় এই আর্সেনিক যৌগ — উচ্চ কম্পাঙ্কে সিলিকনের চেয়েও দ্রুত।
- আর্সেনিক ট্রাই-অক্সাইড () — পুরোনো বিষের ওষুধে ফেরা: ট্রাইসেনক্স নামে বিক্রি হওয়া এই যৌগ এখন অ্যাকিউট প্রোমায়েলোসাইটিক লিউকেমিয়ার স্বীকৃত চিকিৎসা।
- সোনো ফিল্টার: বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রসায়নবিদ আবুল হোসেনের উদ্ভাবন — মরা লোহার কুঁড়ো, কাঠকয়লা, বালু আর ইটের খোয়ার স্তম্ভ, যা নলকূপের পানি থেকে দ্রবীভূত আর্সেনিককে টেনে তুলে ধরে — ২০০৭ সালে দশ-লাখ-ডলারের গ্রেঞ্জার চ্যালেঞ্জ পুরস্কার জিতেছিল।
- ধাতু-মিস্ত্রির চিমটি: খানিকটা আর্সেনিক গাড়ির ব্যাটারির সীসার গ্রিডকে শক্ত করে; আর এর পুরোনো কাজ — কীটনাশক লেড আর্সেনেট ও কাঠ-সংরক্ষক CCA — আজ নিষিদ্ধ বা কড়া নিয়ন্ত্রণে।
◍ দৈনন্দিন উদাহরণ
- গ্রামবাংলার লাল রং করা নলকূপের অর্থ “পান কোরো না” — আর্সেনিক সীমার ওপরে; সবুজ বা নীল দাগ নিরাপদের চিহ্ন — এই রং-সংকেতই অগণিত প্রাণ বাঁচিয়েছে।
- প্রাচীন মিশরীয় শিল্পীরা দেয়ালে ঝলমলে হলুদ চাইলেই ধরতেন অর্পিমেন্ট; আর ভিক্টোরিয়ান যুগের আর্সেনিক-সবুজ ওয়ালপেপার নিঃশব্দে বিষিয়ে দিত নিজের শোবার ঘর।
- ধান ক্ষেতের পানি থেকে আর্সেনিক টেনে নেয় গম বা ভুট্টার চেয়ে অনেক বেশি — এজন্যই বাংলাদেশ তার প্যাডির মাটি আর সেচ-পানি পরীক্ষা করে।
ইতিহাস ও নাম
আর্সেনিকের দুটি উজ্জ্বল সালফাইড খনিজ — সোনালি অর্পিমেন্ট আর লাল রিয়েলগার — মিশরীয়রা প্যাপিরাস ও মন্দিরের দেয়ালে ব্যবহার করত, প্রাচীন বিশ্বজুড়ে এদের বেচাকেনা হতো, অথচ মৌলটির প্রকৃত পরিচয় তখনো অজানা ছিল। প্রায় ১২৫০ সালে পণ্ডিত আলবের্টুস মাগনুস ধাতু-সদৃশ পদার্থটি প্রথম আলাদা করার কৃতিত্ব পান, আর এরপর ছয়শো বছর আর্সেনিক রাজত্ব করল নিখুঁত বিষ হিসেবে — বর্ণহীন যৌগ, কোনো স্বাদ নেই, গন্ধ নেই — ইউরোপে যার ফিসফিস নাম “উত্তরাধিকারের গুঁড়ো”। ১৮৩৬ সালে জেমস মার্শের পরীক্ষা মৃতদেহের ভেতরেও আর্সেনিক ধরতে শেখে — জন্ম নিল ফরেনসিক রসায়ন, শুকিয়ে গেল বিষ-ব্যবসা। তারপর এল আধুনিক মোড়: ১৯৯০-এর দশক থেকে বাংলাদেশ আবিষ্কার করল, বদ্বীপের ধূসর পলির ভেতরে বসানো লাখ লাখ নলকূপ প্রাকৃতিক আর্সেনিকমিশ্রিত পানি তুলে দিচ্ছে খাবার গ্লাসে — বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যাকে বলেছে ইতিহাসের বৃহত্তম গণ-বিষক্রিয়া।
কাছাকাছি মৌল
সারণিতে এই মৌলের ঠিক পাশে বসে থাকা মৌলগুলো — প্রায়ই রসায়নে সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
