
অ্যাক্টিনিয়াম (Ac)
“পর্যায় সারণির দ্বিতীয় f-ব্লক সারির নামদাতা ধাতু — এতই তেজস্ক্রিয় যে অন্ধকারে নিজেই জ্বলে ওঠে ফ্যাকাশে নীল আভায়; রেডিয়ামের চেয়েও প্রায় ১৫০ গুণ হিসেবি।”
ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো
আউফবাউ নীতি থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবের পরিচিত ব্যতিক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়।
নোটগুলো
বৈশিষ্ট্য
- ইলেকট্রন বিন্যাস [Rn] 6d¹ 7s² — পর্যায় ৭, গ্রুপ ৩, f-ব্লক অ্যাক্টিনাইড সারির সূচনা-মৌল; Ac³⁺ আয়ন হিসেবে ল্যান্থানামের রাসায়নিক যমজের মতো আচরণ করে, আর এর পরমাণুতে 5f-এ একটি ইলেকট্রনও নেই।
- অ্যাক্টিনিয়াম-২২৭-এর অর্ধায়ু প্রায় ২২ বছর — স্বাভাবিক “অ্যাক্টিনিয়াম ক্ষয়-সারি”র কেন্দ্র, ইউ-২৩৫-এর ক্ষয়-শৃঙ্খলের সদস্য; ওজন অনুযায়ী ধাতুটির তেজস্ক্রিয়তা রেডিয়ামের প্রায় ১৫০ গুণ।
- অ্যাক্টিনিয়াম-২২৫-এর অর্ধায়ু মাত্র ৯.৯ দিন, অত্যন্ত প্রবল আলফা-বিকিরণকারী — একটি মাত্র ক্ষয়ও একটি ক্যান্সার কোষ মেরে ফেলতে পারে, তাইই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর এত কদর; বছরে গোটা বিশ্বের জোগানও এক চিমটে ওঠে।
- অত্যন্ত বিকিরণ-বিষাক্ত: শরীরের লোহা-পরিবহন পথ ধরে যকৃৎ ও অস্থিমজ্জিতে জমতে থাকে — তাই চোখে দেখার মতো নমুনা কেবল বন্ধ গ্লাভ-বক্সেই ধরা হয়।
নরম, রুপালি-সাদা ধাতু, বাতাসে বেরুতেই দ্রুত ম্লান হয়ে যায়। এর প্রবল বিকিরণ বারবার চারপাশের বায়ুকে আয়নিত করে বলে অন্ধকার ঘরে নমুনাটি ছড়ায় ভুতুড়ে ফ্যাকাশে নীল আভা — কুরিদের যুগের মানুষ যে আলো চিনে রেখেছিল।
কোথায় দেখা মেলে
✦ ব্যবহার
- অ্যাক্টিনিয়াম-২২৫ দিয়ে টার্গেটেড আলফা থেরাপি: PSMA-617-এর মতো টিউমার-খোঁজা অণুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রাণঘাতী আলফা কণা সোজা প্রোস্টেটসহ নানা ক্যান্সার কোষের ভেতরে ছোড়া হয় — নিউক্লিয়ার মেডিসিনের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল নতুন অস্ত্রগুলোর একটি।
- অ্যাক্টিনিয়াম-২২৭ আর বেরিলিয়ামের মিশ্রণ দিয়ে ছোট নিউট্রন-উৎস তৈরি হয় — পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষা আর চুল্লির যন্ত্রপাতি চালু করার কাজে, কারণ এর ক্ষয় বেরিলিয়াম থেকে নিউট্রন ছিটকে বের করে আনে।
- ওষুধের কাঁচামাল অ্যাক্টিনিয়াম-২২৫ আসলে বিশেষভাবে রাখা থোরিয়াম-২২৯-এর মজুদ থেকে “দোয়ানো” হয় — যে সরবরাহ-ব্যবস্থা চালায় বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশ, ফলে আইসোটোপটি পৃথিবীর দুর্লভতম ওষুধগুলোর একটি।
- একসময় দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারির তাপ-উৎস হিসেবেও একে খতিয়ে দেখা হয়েছিল, কিন্তু সঙ্গের ভয়ংকর গামা রশ্মির জন্য মহাকাশ-কর্মসূচির কাজটি গেল প্লুটোনিয়াম-২৩৮-এর ভাগে।
- ক্ষয়-শৃঙ্খলটি নিখুঁতভাবে মাপা বলে বিকিরণ-শনাক্তকারী যন্ত্র যাচাইয়ে এবং নিউক্লিয়ার রসায়নের ক্লাসে “অ্যাক্টিনিয়াম সিরিজ” শেখানোর উদাহরণ হিসেবে এর নমুনা কাজে লাগে।
◍ দৈনন্দিন উদাহরণ
- ইউরেনিয়ামের যেকোনো আকরিকের ভেতরে চুপচাপ থাকে অ্যাক্টিনিয়াম — প্রতি টন ইউরেনিয়ামে মেলে মাত্র প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ মিলিগ্রাম; ১৮৯৯ সালে কুরিদের ফেলে দেওয়া বর্জ্যে দেবিয়ের্ন খুঁজেছিলেন ঠিক এই অতি সামান্য চিহ্নটিই।
- শিক্ষার্থী যে পর্যায় সারণিই খোলে না কেন, অ্যাক্টিনিয়ামের স্বাক্ষর সেখানেই — থোরিয়াম থেকে লরেন্সিয়াম পর্যন্ত পনেরো সদস্যের অ্যাক্টিনাইড সারিটির নামই এই একটি মৌলের নামে।
- “আলফা থেরাপি” বা PSMA-617 ক্যান্সার-নিরীক্ষণের খবর যখন পত্রিকার স্বাস্থ্য-পাতায় আসে, প্রায় প্রতিবারই তা আসলে অ্যাক্টিনিয়াম-২২৫-এর গল্প — চিকিৎসার শিরোনামের ভেতর দিয়েই মৌলটি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছায়।
ইতিহাস ও নাম
১৮৯৯ সালে কুরি দম্পতি রেডিয়াম বের করে ফেলে দেওয়া পিচব্লেন্ডের বর্জ্য ঘেঁটে ফরাসি রসায়নবিদ আঁদ্রে-লুই দেবিয়ের্ন আলাদা করলেন আরেকটি নতুন তেজস্ক্রিয় মৌল — গ্রিক aktis (রশ্মি) থেকে নাম দিলেন অ্যাক্টিনিয়াম। ১৯০২ সালে ফ্রিডরিশ গিজেল স্বাধীনভাবে একে খুঁজে পেয়ে কিছুকাল “এমানিয়াম” নামে ডাকলেও শেষ পর্যন্ত দেবিয়ের্নের দেওয়া নামটিই টিকল। নিজের সারির প্রথম সদস্য হিসেবে অ্যাক্টিনিয়াম পরে পুরো অ্যাক্টিনাইড শ্রেণিকেই নাম দিল — যদিও দশকের পর দশক পাঠ্যবই একে ভুল করে ল্যান্থানামের পাশে বসিয়ে রেখেছিল, শেষে ১৯৪৪ সালে সিবোর্গের অ্যাক্টিনাইড-ধারণাই সারিটিকে সুষ্ঠু জায়গায় বসাল।
কাছাকাছি মৌল
সারণিতে এই মৌলের ঠিক পাশে বসে থাকা মৌলগুলো — প্রায়ই রসায়নে সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
