
থোরিয়াম (Th)
“নর্স বজ্রদেবতার নামে নামকরণ — সৈকতের বালিতে, এমনকি বাংলাদেশের নিজের সৈকতেই যথেষ্ট মজুদ, থোরিয়ামের যুগ এলে শতাব্দীর পর শতাব্দী চুল্লির জ্বালানি জুটবে।”
ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো
আউফবাউ নীতি থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবের পরিচিত ব্যতিক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়।
নোটগুলো
বৈশিষ্ট্য
- ইলেকট্রন বিন্যাস [Rn] 6d² 7s² — পর্যায় ৭-এর f-ব্লক অ্যাক্টিনাইড, যার পরমাণু 5f-এ বরাবরই ইলেকট্রন নিতে চায় না; জলে প্রায় শুধুই থাকে Th⁴⁺ আয়নে — যেকোনো মৌলের সবচেয়ে স্থিতিশীল +4 অবস্থার একটি।
- থোরিয়াম-২৩২-এর অর্ধায়ু ১৪০৫ কোটি বছর — মহাবিশ্বের বয়স ১৩৮০ কোটি বছরকেও ছাড়িয়ে গেছে; তাই পৃথিবীর জন্মকালের আদি থোরিয়াম আজও হালকা আলফা-সক্রিয় হয়ে রয়ে গেছে।
- এটি ফার্টাইল, ফিসাইল নয়: একটি নিউট্রন গিলে প্রোট্যাক্টিনিয়াম-২৩৩ হয়ে বদলে যায় ফিসাইল ইউরেনিয়াম-২৩৩-এ — থোরিয়াম জ্বালানি-চক্র আর ভারতের তিন-পর্যায়ের পরিকল্পনার প্রাণ এখানেই।
- ভূত্বক্ষে ইউরেনিয়ামের চেয়ে তিন-চার গুণ প্রাপ্ত; আকরিক মোনাজাইট ঘন, ভারী এক ধরনের বালি, যা নদীর স্রোত আর ঢেউয়ে গড়িয়ে সৈকতে ও নদীতলে স্তূপ হয়ে জমে।
ঝকঝকে রুপালি ধাতু, বাতাসে ধীরে ধূসর-কালো হয়ে যায়; নরম বলে কেটে পাত ও তারে টানা যায়। এর গুঁড়া আপনা-আপনি জ্বলে উঠতে পারে, তবু অর্ধায়ু এত দীর্ঘ যে ধাতুর টুকরো মাত্র সামান্য উষ্ণ — তেজস্ক্রিয় মৌলদের মধ্যে এক শান্ত দৈত্য।
কোথায় দেখা মেলে
✦ ব্যবহার
- গ্যাস-লণ্ঠনের ম্যান্টেল: প্রায় ৯৯% থোরিয়াম অক্সাইডে সামান্য সিরিয়াম মিশিয়ে বোনা “ওয়েলসবাখ ম্যান্টেল” খোলা শিখায় ঝলমলে সাদা জ্বলে ওঠে — গ্যাস-বাতির যুগের আলো, আজও ক্যাম্পিং লণ্ঠনে বিক্রি হয়।
- TIG ওয়েল্ডিংয়ের থোরিয়েটেড টাংস্টেন ইলেকট্রোড বেশি কারেন্টেও পাথরের মতো স্থির আর্ক ধরে রাখে — নিরাপদ বিকল্প ঢুকলেও কারখানায় এখনো এদের সম্মান রয়েছে।
- ভবিষ্যতের পারমাণবিক জ্বালানি: থোরিয়াম-২৩২ থেকে জন্ম নেওয়া ইউরেনিয়াম-২৩৩ দিয়ে চুল্লি চালানো যেতে পারে — আকরিক বেশি, দীর্ঘস্থায়ী বর্জ্য কম, অস্ত্র বানানোও কঠিন; ভারতের তিন-পর্যায়ের পরিকল্পনার ভিত্তিই এই রসায়ন।
- ১৯৫০-৬০-এর দশকের থোরিয়েটেড ক্যামেরার লেন্সে বাড়তি উজ্জ্বলতার জন্য থোরিয়াম অক্সাইড মেশানো হতো; সংগ্রাহকের আলমারিতে লেন্সগুলো ধীরে ধীরে বাদামি-বাদামি হয়ে যায়।
- চিকিৎসার শিক্ষাদায়ক অতীত: ১৯৩০-৫০-এর দশকে রোগীর শরীরে দেওয়া এক্স-রে কনট্রাস্ট “থোরোট্রাস্ট” (থোরিয়াম ডাইঅক্সাইডের কলয়েড) কয়েক দশক পরে ক্যান্সার ডেকে এনেছিল — তা থেকেই চিকিৎসাবিজ্ঞান তেজস্ক্রিয়তার পাঠ শেখে।
◍ দৈনন্দিন উদাহরণ
- বাংলাদেশের কক্সবাজার ও টেকনাফের সৈকত-বালিতে ভারী খনিজের সঙ্গে মোনাজাইট থাকে — পারমাণবিক শক্তি কমিশনের জরিপে চিহ্নিত দেশের নিজেরই চুপচাপ-তেজস্ক্রিয় থোরিয়ামের ভাণ্ডার।
- ঢাকায় কেনা একটি ক্যাম্পিং গ্যাস-লণ্ঠনে এখনো থোরিয়ামের ম্যান্টেল লাগতে পারে — তার সাদা-উজ্জ্বল আলো বিশ শতকের রাস্তার বাতিরই পুনর্জন্ম।
- ১৯৫০-এর দশকের শহরের সেই ছবিগুলোতে — যেখানে শিঁশ শিঁ শব্দে গ্যাস-বাতি জ্বলছে — দেখা যায় থোরিয়াম ম্যান্টেলের ফ্যাকাশে ঝকঝকে সাদা আলো; ইতিহাসের বইয়ের পাতাতেই শিক্ষার্থীর সেই যুগের সঙ্গে দেখা।
ইতিহাস ও নাম
১৮২৮ সালে সুইডিশ রসায়নের কুলপতি ইয়ন্স ইয়াকব বার্জেলিয়াসের হাতে আসে নরওয়ের লোভোয়া দ্বীপে পাওয়া এক অদ্ভুত ভারী কালো খনিজ, আর তা থেকেই তিনি শনাক্ত করলেন একেবারে নতুন এক মৌলের অক্সাইড — হাতুড়িধারী নর্স বজ্রদেবতা থোরের নামে রাখলেন থোরিয়াম। পুরো এক শতাব্দী এ ছিল নিছক রসায়ন-কৌতূহল — তারপর ১৮৯৮ সালে কুরি দম্পতির তেজস্ক্রিয়তা-আবিষ্কারে জানা গেল থোরিয়াম নিজেও তেজস্ক্রিয়, আর ১৯০১-০২ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড ও ফ্রেডেরিক সডি থোরিয়াম দিয়েই প্রমাণ করলেন, তেজস্ক্রিয় ক্ষয় মানে এক মৌল বদলে অন্য মৌল হয়ে যাওয়া। থোরিয়াম-চুল্লির স্বপ্ন ১৯৫০-এর দশক থেকে জমেছে, আজও ভারতের তিন-পর্যায়ের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বেঁচে আছে।
কাছাকাছি মৌল
সারণিতে এই মৌলের ঠিক পাশে বসে থাকা মৌলগুলো — প্রায়ই রসায়নে সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
