
ইউরেনিয়াম (U)
“পৃথিবীর আদিম ভারীতম মৌল — এর ভাঙা পরমাণু পোড়ানোর চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি শক্তি ছাড়ে; বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের জ্বালানি এটিই।”
ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো
আউফবাউ নীতি থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবের পরিচিত ব্যতিক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়।
নোটগুলো
বৈশিষ্ট্য
- ইলেকট্রন বিন্যাস [Rn] 5f³ 6d¹ 7s² — পর্যায় ৭-এর f-ব্লক অ্যাক্টিনাইড; রসায়নে +৪ (সবুজ দ্রবণ) আর +৬ (হলদে ইউরানাইল আয়ন ²⁺)-এর মাঝে দোল খায়।
- মুখ্য দুই আইসোটোপ: ফিসাইল ইউ-২৩৫ (প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের মাত্র ০.৭২%, অর্ধায়ু ৭০.৪ কোটি বছর) চেইন বিক্রিয়া টিকিয়ে রাখে; আর ফার্টাইল ইউ-২৩৮ (৯৯.২৭%, অর্ধায়ু ৪৪৭ কোটি বছর — পৃথিবীর বয়সই) নিউট্রন শুষে নিয়ে প্লুটোনিয়াম জন্ম দিতে পারে।
- ইউ-২৩৫-এর একটি নিউক্লিয়াস বিভাজিত হলে মুক্ত হয় প্রায় ২০ কোটি ইলেকট্রন-ভোল্ট — কয়লা পোড়ানোর তুলনায় প্রতি পরমাণুতে প্রায় দশ লক্ষ গুণ শক্তি; একটি মুঠো-সমান ফুয়েল পেলেটের জোর প্রায় এক টন কয়লার সমান।
- অগাধ ধৈর্যের তেজস্ক্রিয়তা: ইউ-২৩৮-এর ৪৪৭ কোটি বছরের অর্ধায়ু বলে পৃথিবীর জন্মকালের ইউরেনিয়াম আজও রয়ে গেছে — প্রতি টন গ্রানাইটে কয়েক গ্রাম, আর সাগরের প্রতি লিটার জলে দ্রবীভূত প্রায় ৩ মাইক্রোগ্রাম।
ঘন, রুপালি-ধূসর ধাতু — সীসার প্রায় দ্বিগুণ ভারী; গায়ে গাঢ় অক্সাইডের পর্দা পড়ে ধীরে ধীরে গুঁড়া হয়ে যায়। সদ্য কাটলে ইস্পাতের মতো ঝলমলে, কিন্তু ঔজ্বলতা টেকে না — অস্থির এই ধাতুর বুকে বাজে নিউক্লিয়ার-শক্তি।
কোথায় দেখা মেলে
✦ ব্যবহার
- পারমাণবিক বিদ্যুৎ: ইউরেনিয়াম ডাইঅক্সাইডের পেলেট ইউ-২৩৫-এ ৩–৫% সমৃদ্ধ করে বিশ্বের বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হয় — ইশ্বরদী, পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি রুশ VVER-1200 ইউনিটও তারই দামামা, বাংলাদেশের প্রথম।
- নৌ-চালিকা শক্তি: সাবমেরিন আর বিমানবাহী রণতরী কমপ্যাক্ট উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোরে বছরের পর বছর জ্বালানি ভরতি ছাড়াই ভেসে বেড়ায়।
- চিকিৎসা ও গবেষণা: ইউরেনিয়াম-জ্বালানির চুল্লিতে জন্ম নেয় চিকিৎসা-আইসোটোপ মলিবডেনাম-৯৯ — হাসপাতালের স্ক্যানে ব্যবহৃত টেকনেশিয়াম-৯৯ম-এর জননী — আর মেলে পদার্থ-গবেষণার নিউট্রন-রশ্মি।
- ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়াম — সমৃদ্ধকরণের প্রায়-খাঁটি ইউ-২৩৮ বর্জ্য: অকল্পনীয় ঘনত্বের জন্য বিমানের কাউন্টারওয়েট, গামা-বিকিরণের ঢাল আর বর্ম-ভেদী গোলাবারুদে জুতো হিসেবে মানানসই।
- পৃথিবীর ঘড়ি পড়া: জিরকন স্ফটিকের ভেতরে আটকে থাকা ইউরেনিয়াম–সীসা ক্ষয়-ঘড়ি পাকড়ে দিয়েছে পৃথিবীর প্রাচীনতম খনিজের বয়স — প্রায় ৪৪০ কোটি বছর।
◍ দৈনন্দিন উদাহরণ
- রূপপুর নিয়ে পত্রিকার প্রতিটি খবর — টারবাইন পরীক্ষা, জ্বালানি লোডিং, জাতীয় গ্রিডের জন্য ২৪০০ মেগাওয়াট — বাংলাদেশের বেঁচে থাকা ইউরেনিয়াম-গাথা, সংবাদের পাতায়।
- দিনাজপুরের মাদ্দাপাড়া হার্ডরক খনির গ্রানাইট বেশিরভাগ গ্রানাইটের মতোই প্রতি টনে কয়েক গ্রাম ইউরেনিয়াম বয়ে বেড়ায়; কক্সবাজারের ভারী-বালির খনিজেও তার চিহ্ন আছে।
- পুরনো জিনিসের দোকানে মাঝে মাঝে মেলে ইউরেনিয়াম গ্লাস (“ভ্যাসলিন গ্লাস”) — অতিবেগুনি টর্চের আলো ফেললেই সে সবুজ আভায় ঝলমল করে ওঠে; পারমাণবিক যুগের নিরীহ ছোট্ট স্মারক।
ইতিহাস ও নাম
১৭৮৯ সালে বার্লিনের অ্যাপোথেকারি-রসায়নবিদ মার্টিন হাইনরিখ ক্লাপ্রোথ বোহেমিয়ার পিচব্লেন্ড নমুনা গুলে এক অদ্ভুত হলদে পদার্থ অধঃক্ষেপিত করে নতুন মৌলের ঘোষণা দিলেন — মাত্র আট বছর আগে আবিষ্কৃত গ্রহ ইউরেনাসের নামে রাখলেন ইউরেনিয়াম। তাঁর “ধাতু” আসলে ছিল কেবল অক্সাইড; আসল ধাতু এল ১৮৪১ সালে, প্যারিসে ইউজিন-মেলকিয়র পেলিগো যখন পটাশিয়াম দিয়ে ইউরেনিয়াম টেট্রাক্লোরাইড বিজারিত করলেন। এরপর ১৮৯৬ সালে এল সেই মোড়, যা পদার্থবিজ্ঞান লিখে দিল: অঁরি বেকেরেল দেখলেন মোড়ানো ফটোগ্রাফিক প্লেটের ওপর রাখা ইউরেনিয়ামের লবণ কোনো আলো ছাড়াই প্লেট ঝাপসা করে দেয় — এটিই তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কার, যার নামকরণ ও গবেষণা শীঘ্রই করলেন মেরি কুরি। অবশেষে ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে অটো হান ও ফ্রিৎস শ্ট্রাসমান নিউট্রন দিয়ে ইউরেনিয়াম ভাঙলেন — চুল্লি, বোমা আর পারমাণবিক যুগের দরজা খুলে গেল।
কাছাকাছি মৌল
সারণিতে এই মৌলের ঠিক পাশে বসে থাকা মৌলগুলো — প্রায়ই রসায়নে সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
