জেমস চ্যাডউইক
নিউট্রনের আবিষ্কারক
জেমস চ্যাডউইকের জন্ম ১৮৯১ সালে ইংল্যান্ডের চেশায়ারের ছোট্ট বস্তিকারখানার শহর বলিংটনে; বেড়ে ওঠেন মূলত ঠাকুমার কাছে — বাবা-মা চালাতেন এক লন্ড্রি। বৃত্তি ধরে ধরে তিনি উঠে এলেন স্থানীয় স্কুল থেকে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত — যেখানে ভর্তির কাগজের গোলমালে গণিতের বদলে পদার্থবিজ্ঞানে নাম লেখা হয়ে গেল; লাজুক কিশোরটি ভাবল, ভুলটা পরে শুধরে নেব — আর আবিষ্কার করল, বিষয়টাই তাঁর এত পছন্দের যে আর ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। রাদারফোর্ডের তত্ত্বাবধানে মাস্টার্স শেষ করে ১৯১৩ সালে তিনি চলে গেলেন বার্লিনে, নতুন রেডিওঅ্যাক্টিভিটি গবেষণার এক শীর্ষ হাত হান্স গাইগারের কাছে। আর সেখানেই যুদ্ধ এসে আটকে দিল তাঁকে: শত্রু নাগরিক হিসেবে চার বছর আটকে থাকলেন রুলেবেন ক্যাম্পে, সহবন্দির সঙ্গে ঘোড়ার আস্তাবলে হাতে-গোঁজা যন্ত্রপাতি দিয়ে যথাসাধ্য পদার্থবিজ্ঞান চালিয়ে।
দেশে ফিরে ১৯১৯ সালে রাদারফোর্ডের পিছু পিছু ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে, আর হয়ে উঠলেন সেই শিকারের নিঃশব্দ ইঞ্জিন, যার কথা রাদারফোর্ড দিয়েছিলেন ১৯২০ সালে: প্রোটন আর ইলেকট্রন মিলেমিশে এক হতে পারলে দাঁড়াবে এমন এক পরমাণু, যার ওপর কোনো চার্জই নেই। ১৯৩০ সালে জার্মান বিজ্ঞানী বোটে আর বেকার দেখলেন, আলফা কণার গোলাবর্ষণে বেরিলিয়াম ছাড়ে বিস্ময়কর ভেদনক্ষমতার এক বিকিরণ; ১৯৩২ সালে জোলিও-কুরি দম্পতি দেখালেন, এই বিকিরণ প্যারাফিন মোমের ভেতর থেকে প্রোটন ছিটকে বের করে দিতে পারে — কিন্তু তাঁরা সেটিকে পড়লেন গামা রশ্মিরই আশ্চর্য এক রূপ হিসেবে। শক্তির হিসাব কখনই মেলে না — এটা জানা থাকায় চ্যাডউইক ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিনা বিশ্রামে পরীক্ষা চালিয়ে Nature পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলেন উত্তরের চিঠি: এটা কোনো বিকিরণই নয়, নিরপেক্ষ কণার স্রোত — প্রতিটির ভর প্রায় প্রোটনের সমান; রাদারফোর্ড যে কণার ছবি এঁকে নাম দিয়েছিলেন — নিউট্রন। এরই পুরস্কার ১৯৩৫ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল।
নিউট্রন এক কলমে ব্যাখ্যা করে দিল আইসোটোপ — একই মৌলের পরমাণু, প্রোটন সমান, নিউট্রন আলাদা — আর যেহেতু ওর ওপর চার্জ নেই, ও নির্বিঘ্নে ঢুকে পড়তে পারে যেকোনো নিউক্লিয়াসে; নিউক্লিয়ার যুগের মাস্টার-চাবি তাই এটাই: সাত বছরের মধ্যেই এল ফিশন, তার সঙ্গে চুল্লি, বোমা আর হাসপাতালের রোজকার নিউট্রন-বানানো চিকিৎসা-আইসোটোপ। চ্যাডউইক কাটালেন সেই যুদ্ধটার ভেতরেই — MAUD কমিটিতে, যারা রায় দিল পরমাণু বোমা বানানো সম্ভব; তারপর ম্যানহাটান প্রকল্পে ব্রিটিশ মিশনের প্রধান হয়ে লস আলামোসে, যেখানে কথায় কথায় নীরব এই ইংরেজ হয়ে উঠলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানের এমন এক প্রতিনিধি, যাঁকে জেনারেল গ্রোভস পর্যন্ত বিশ্বাস করতেন। ১৯৪৫ সালে নাইট উপাধি, তারপর হারওয়েলে ব্রিটেনের অ্যাটমিক এনার্জি রিসার্চ এস্টাবলিশমেন্টের নেতৃত্ব, জীবনের শেষ দিকে কেমব্রিজের গনভিল অ্যান্ড কায়াস কলেজের মাস্টার। ১৯৭৪ সালে তাঁর মৃত্যু হলো — শেষ পর্যন্ত নীরব।
“এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল যে বিকিরণটি এতদিন যেমন ভাবা হতো তেমন কোয়ান্টা নয়, বরং নিউট্রন — ভর ১ ও চার্জ ০ এমন কণা।”
ছাত্রছাত্রীরা আজও কেন নামটা চেনে
এনসিটিবি থেকে এইচএসসি — তোমার পরমাণুর গঠনের ছবির তিনটি লেবেল প্রোটন, নিউট্রন, ইলেকট্রন; মাঝের নামটি চ্যাডউইকের উপহার। নিউট্রন এক কলমে আইসোটোপের ব্যাখ্যা দিল, আর চার্জহীন বলে যেকোনো নিউক্লিয়াসের ভেতরে ঢুকে পড়ার ক্ষমতাই খুলে দিল ফিশন, চুল্লি আর হাসপাতালের কাছে অপরিহার্য চিকিৎসা-আইসোটোপের দরজা। বেরিলিয়াম, হাইড্রোজেন আর হিলিয়ামের মালা তাঁর পরীক্ষার গল্পটাই বলে। নীরব, ধৈর্যশীল, শেষ দশমিক পর্যন্ত নির্ভুল — সবচেয়ে বড় আবিষ্কার কখনো কখনো তাঁদেরই প্রাপ্য, যাঁরা শুধু মেপে চলেন।
