
প্লাটিনাম (Pt)
“স্প্যানিশ স্বর্ণ-খনির শ্রমিকরা যাকে ঘৃণায় “ছোট্ট রুপো” ডাকত — আজ সেই ধাতুই প্রতিটি আধুনিক গাড়ির ধোঁয়া শুদ্ধ করা অভিজাত প্রভাবক।”
ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো
আউফবাউ নীতি থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবের পরিচিত ব্যতিক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়।
নোটগুলো
বৈশিষ্ট্য
- রাসায়নিকভাবে অভিজাত: বাতাস, পানি ও একক অ্যাসিড কক্ষ তাপমাত্রায় একে ছুঁয়েও কিছু করতে পারে না — শুধু অ্যাকোয়া রেজিয়া আর গলিত ক্ষার ধীরে গলায়; তাই প্লাটিনামের গায়ের ঔজ্জ্বল্য শতাব্দী পেরিয়ে যায়।
- প্রভাবক-মহারথী — কক্ষ তাপমাত্রাতেই প্লাটিনামের জালিকায় হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন জুড়ে পানি হয়ে যেতে পারে; নীরব এই ক্ষমতাই চালায় গাড়ির ধোঁয়া শোধন থেকে শিল্পের পাহাড়-প্রমাণ রসায়ন।
- ঘনত্ব ২১.৪৫ গ্রাম/ঘন সেন্টিমিটার, গলে ১৭৬৮° সেলসিয়াসে; তবু খাঁটি অবস্থায় এতই নমনীয় যে গয়নাকাররা সোনার মতোই গড়েন; আর গলন্ত কাচ এর গায়ে ভিজেই ওঠে না — কাচ-শিল্পের খুঁটাইয়ের জন্য আশীর্বাদ।
- চেনা অফবাউ-বিদ্রোহী: সরল নিয়মে [Xe] 4f¹⁴ 5d⁸ 6s² হওয়ার কথা হলেও প্লাটিনামের পরমাণু বসে [Xe] 4f¹⁴ 5d⁹ 6s¹ — একটি 6s ইলেকট্রন খরচ করে কম শক্তির প্রায়-পূর্ণ 5d বিন্যাস ধারণ করে।
ঘন, রূপালি-সাদা ধাতু, যার চাঁদের আলো-ধরা নিস্তেজ দ্যুতি কোনোদিন ম্লান হয় না। এত অভিজাত হয়েও গড়ানোর মতো আশ্চর্য নমনীয় — এক গ্রাম থেকেই কয়েকশ মিটার লম্বা সূক্ষ্ম তার টানা যায়, আর গলন্ত কাচ এর গা ঘেঁষে পিছলে যায়, আঁঠা হয় না।
কোথায় দেখা মেলে
✦ ব্যবহার
- আধুনিক গাড়ির ক্যাটালিটিক কনভার্টার: প্লাটিনামে (সঙ্গে প্যালাডিয়াম ও রোডিয়াম) মোড়া মৌচাক-জাল বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইডকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন গ্যাসে বদলে দেয়।
- বিশ্লেষণী রসায়নের প্লাটিনাম ক্রুসিবল ও থালা — এর ভেতরে কড়া ফ্লাক্স দিয়ে পাথরের গুঁড়োও গলানো যায়, তারপরও পাত্রটি ধুয়ে অবিকৃত অবস্থায় ওজন করা চলে, কারণ কিছুই সঙ্গে বিক্রিয়া করে না।
- সিসপ্লাটিন-পরিবারের কেমোথেরাপি ওষুধ — কেন্দ্রের প্লাটিনাম পরমাণু টিউমারের DNA-তে ক্রসলিংক পেঁচায়; এই পদ্ধতিই টেস্টিকুলার ক্যান্সারকে প্রায় সারযোগ্য করেছে।
- মর্যাদার বিয়ের আংটি ও ঘড়ির বডি — অ্যালার্জি করে না, কালশিটে না — তাছাড়া সূক্ষ্ম ইলেকট্রোড, কাচ-শিল্পের খুঁটাই আর অবসর নেওয়া প্লাটিনাম-ইরিডিয়ামের আদর্শ কিলোগ্রাম।
◍ দৈনন্দিন উদাহরণ
- বাংলাদেশের রাস্তার নতুন বাস-গাড়ির ধোঁয়া পেছনের পাইপ ছাড়ার আগে প্লাটিনাম-ধারী কনভার্টারে সেঁটিয়ে শুদ্ধ হয়।
- ঢাকার শপিং মলের গয়নার কাউন্টারে প্লাটিনামের আংটিতে দেখা যায় “PT 950” ছাপ — ৯৫ শতাংশ খাঁটি; কারো কারো সংকর যেভাবে ত্বকে কালো করে, এ করে না বলেই পছন্দ।
- বিশ্বের ক্যান্সার ওয়ার্ডগুলোতে সিসপ্লাটিনের ভায়াল মজুত থাকে; ওষুধের কেন্দ্রের প্লাটিনাম পরমাণুটিই টিউমার কোষের DNA-নকলের যন্ত্র আটকে দেয়।
ইতিহাস ও নাম
ইউরোপ না-জানা আরও হাজার বছর আগেই ইকুয়েডরের প্রাচীন লা তোলিতার কারিগররা প্লাটিনাম সিন্টার করে অলংকার গড়ত। দক্ষিণ আমেরিকায় সোনা ধুতে ধুতে স্প্যানিশ শ্রমিকরা হঠকারি সাদা দানাগুলোকে রীস করে বলত platina — “ছোট্ট রুপো” — আর সোনা খাঁটি রাখত সেগুলো ফেলে দিয়ে। ১৭৩৫ সালে ওই অঞ্চলে জরিপরত স্প্যানিশ বিজ্ঞানী আন্তোনিও দে উইয়োয়া অদ্ভুত ধাতুটির খবর ইউরোপে ফিরিয়ে আনেন, আর দশকের পর দশক রসায়নবিদরা ধাঁধায় পড়ে থাকেন — যে জিনিস গলানো যায় না, রুপো থেকে নিশ্চিতভাবে আলাদাও করা যায় না। ১৮০০-এর দশকের শুরুতে নমনীয় প্লাটিনাম অবশেষে আয়ত্ত হলে একে একে সে হয়ে ওঠে ল্যাবরেটরির পাত্র, আদর্শ মিটার ও কিলোগ্রাম, আর রাসায়নিক শিল্পের প্রভাবক-মেরুদণ্ড।
কাছাকাছি মৌল
সারণিতে এই মৌলের ঠিক পাশে বসে থাকা মৌলগুলো — প্রায়ই রসায়নে সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
