
পারদ (Hg)
“একমাত্র ধাতু যা পানির মতো বয়ে যায়, রুপোর মতো ঝকঝকে — আর যার অদৃশ্য বাষ্প জগতে “বিষক্রিয়া” শব্দের মানে শিখিয়েছে।”
ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো
আউফবাউ নীতি থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবের পরিচিত ব্যতিক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়।
নোটগুলো
বৈশিষ্ট্য
- কক্ষ তাপমাত্রায় তরল, কারণ 5d¹⁰ 6s² শেল দুটি পূর্ণ আর ইলেকট্রনগুলোকে শক্ত করে আঁকড়ে রাখে — ধাতব বন্ধন এতই দুর্বল যে −৩৯° সেলসিয়াসের ওপরে ধাতুটি গলে গড়িয়েই যায়।
- আরও নানা ধাতুকে গুলিয়ে নিয়ে অ্যামালগম বানায়: রুপা-টিনের অ্যামালগম এক শতাব্দী ধরে দাঁত ভরার কাজ করেছে, আর কুটির সোনা-খনির শ্রমিকরা আজও সোনাকে পারদের পেস্টে আটকে — নিষিদ্ধ হয়েও জেদি চর্চা।
- বাষ্পটি নিঃশব্দ বিষ — বর্ণহীন, গন্ধহীন হয়ে স্নায়ু ও কিডনিতে জমে; “ম্যাড অ্যাজ অ্যা হ্যাটার” প্রবাদে বাঁচা আছে পারদের নাইট্রেটে কাঁপতে থাকা টুপি-কারিগরদের ছবি, আর মিনামাটার মাছবাহিত মহামারি দেখিয়েছে মিথাইলমার্কারি খাদ্যশৃঙ্খল বেয়ে কীভাবে ওপরে ওঠে।
- রসায়নে উদাসীন অথচ স্থির-মেজাজি: লোহা খেয়ে ফেলা লঘু অ্যাসিড একে এড়িয়ে যায়, তবু তাপমাত্রার সঙ্গে এটি মসৃণভাবে সমান হারে প্রসারিত হয় — এই গুণেই একে বিশ্বের থার্মোমিটারের তরল বানানো হয়েছিল।
ভারী, রূপালি তরল — কক্ষ তাপমাত্রায় তরল একমাত্র ধাতু; জমে কঠিন হতে নামতে হয় −৩৯° সেলসিয়াস পর্যন্ত। পৃষ্ঠটান এত প্রবল যে পড়ে থাকা পারদ ভেঙে দৌড়ে যাওয়া বিন্দুতে রূপ নেয়, আর এর এক লিটার বোতল স্কেলের কাঁটা টেনে নিয়ে যাবে প্রায় ১৩.৫ কেজির দিকে।
কোথায় দেখা মেলে
✦ ব্যবহার
- থার্মোমিটার, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র আর টরিচেলির ঢঙের ব্যারোমিটার — তিন শতাব্দী ধরে জ্বর আর আবহাওয়া মেপে কাজ করা রূপালি সুতো; বাংলাদেশও যোগ দেওয়া মিনামাটা কনভেনশনের নির্দেশে এখন ডিজিটাল সেন্সরের কাছে আসন ছাড়ছে।
- ফ্লুরোসেন্ট টিউবলাইট ও CFL বাল্ব: পারদের বাষ্পে বিদ্যুৎ-স্রাব অতিবেগুনী আলো জোগায়, আর কাচের গায়ের ফসফর আস্তরণ সেই UV-কে সাদা আলোয় বদলে দেয়।
- দাঁতের অ্যামালগম — পারদের সঙ্গে রুপা-টিনের সংকর ঘষে মাখিয়ে — বিংশ শতাব্দী জুড়ে শত কোটি দাঁত ভরার মজবুত উপাদান।
- বিভব-মাপন রসায়নের ক্লাসিক ক্যালোমেল তড়িৎদ্বার, আর সায়ানাইড-পদ্ধতির দখলের আগে নদীর বালি থেকে সোনা ধরার ইতিহাস-খ্যাত অ্যামালগম-ফাঁদ।
◍ দৈনন্দিন উদাহরণ
- পরিবারের ওষুধের বাক্সে গড়াগড়ি খাওয়া পুরনো কাচের থার্মোমিটারটাই — পারদের রূপালি সুতো — এখন ঝুড়িতে নয়, বিপজ্জনক বর্জ্য হিসেবে জমা দিতে হয়।
- শ্রেণিকক্ষ-অফিসের প্রতিটি ফ্লুরোসেন্ট টিউবে থাকে কয়েক মিলিগ্রাম পারদের বাষ্প — ভাঙা নল তাই ঝাঁটা-ঝুড়িতে নয়, আলাদা রিসাইক্লিংয়ে যায়।
- ঐতিহ্যবাহী লাল সিঁদুরের রং এক যুগে আসত সিনাবার থেকে — পারদের সালফাইড (), যেই আকরিক পুড়িয়েই ধাতুটি বের করা হয়।
ইতিহাস ও নাম
প্রাচীনকাল থেকেই পারদ মানুষের চেনা: খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৫০০ অব্দের মিশরীয় সমাধিতে এর শিশি মজুত পাওয়া গেছে, আর কিমিয়াবিদদের চোখে “জীবন্ত রুপো” ছিল ধাতুত্বেরই সারমর্ম। গ্রিকরা বলত hydrargyros অর্থ “পানি-রুপো” — লাতিনে তা হলো hydrargyrum, আর রসায়নের চিহ্ন Hg; ইংরেজি mercury নামটি দ্রুতগামী দূত-দেবতা মার্কিউরির প্রতি শ্রদ্ধা — সহজ ভাষায় কুইকসিলভার। ১৬৪৩ সালে টরিচেলি বায়ুমণ্ডলের বিপরীতে পারদের স্তম্ভ দাঁড় করিয়ে ব্যারোমিটার আবিষ্কার করেন, আর তিন শতাব্দী ধরে পারদ-থার্মোমিটারই ছিল বিশ্বের মানদণ্ড — যতক্ষণ না ১৯৫০-এর দশকের জাপানের মিনামাটার দুর্ঘটনা ধাতুটির অন্ধকার দিক খুলে দেয় এবং ২০১৩ সালে জন্ম নেয় মিনামাটা কনভেনশন, যা আজ বিশ্বজুড়ে একে অবসর দিচ্ছে।
কাছাকাছি মৌল
সারণিতে এই মৌলের ঠিক পাশে বসে থাকা মৌলগুলো — প্রায়ই রসায়নে সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
