জন ডাল্টন
পরমাণু-তত্ত্বের পথিকৃৎ — যে শান্ত কোয়েকার বলেছিলেন, জড় ক্ষুদ্র কণার তৈরি
জন ডাল্টন জন্মেছিলেন ১৭৬৬ সালে, ইংল্যান্ডের কাম্বারল্যান্ডের ঈগলসফিল্ড গ্রামে, এক দরিদ্র কোয়েকার তাঁতির ঘরে। কোয়েকাররা ছিলেন ধর্মীয় সংখ্যালঘু — সে যুগে ইংল্যান্ডের বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা তাঁদের জন্য বন্ধ ছিল। তাই ডাল্টনের শ্রেণিকক্ষ ছিল নিজের জিজ্ঞাসা: মাত্র পনেরো বছর বয়সেই তিনি বড় ভাইয়ের সঙ্গে মিলে কেন্ডালে এক বোর্ডিং স্কুল চালাতেন, ছোট ছেলেদের পড়াতেন সেই গণিত, যা নিজে নিজে শিখে নিয়েছিলেন। ১৭৮৭ সাল থেকে তিনি রাখতেন এক আবহাওয়ার ডায়েরি — বাতাস, বৃষ্টি আর ব্যারোমিটারের প্রায় দুই লাখ পাঠ, লেখা হয়েছে প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত। মাথার ওপরের আকাশেই নিয়ম খুঁজতে গিয়ে তিনি খুঁজে পেলেন একটি সূত্র: আংশিক চাপের সূত্র — গ্যাসের মিশ্রণে প্রতিটি গ্যাস এমনভাবে চাপ দেয়, যেন পুরো জায়গাটা সে-ই একা দখল করে আছে। ১৭৯৩ সালে শিক্ষক হয়ে চলে গেলেন ম্যানচেস্টারে — আর সেখানেই কেটে গেল পঞ্চাশটি বছর।
এক সন্ধ্যায় মোমবাতির আলোয় তিনি দেখলেন, টেবিলে রাখা গোলাপি জেরেনিয়াম ফুলটা তাঁর চোখে আকাশি নীল — অথচ ঘরের বাকি সবাই বলছে, ফুল তো একই রকম গোলাপি। কৌতূহলী ডাল্টন বছরের পর বছর নিজের ওপর পরীক্ষা চালালেন — ফিতে, সিলমোহর, পশমের নোলতা দিয়ে — আর ১৭৯৪ সালে ম্যানচেস্টার লিটেরারি অ্যান্ড ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির সামনে পড়ে শোনালেন রঙ-অন্ধত্ব নিয়ে লেখা পৃথিবীর প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ। মৃত্যুর পর যেন তাঁর চোখদুটো পরীক্ষা করা হয় — এই অনুরোধও তিনি রেখে গিয়েছিলেন। শত পঞ্চাশ বছর পরে, ১৯৯৫ সালে, সেই সংরক্ষিত চোখের ডিএনএ পরীক্ষা করে প্রমাণ হলো তাঁর অনুমানই সঠিক: তিনি ছিলেন লাল-সবুজ রঙে অন্ধ। রোগটির আন্তর্জাতিক নাম আজও — ডাল্টনিজম।
গ্যাস কেন পানিতে দ্রবীভূত হয়, আর মৌলগুলো কেন সবসময় নির্দিষ্ট অনুপাতে যুক্ত হয় — এসব প্রশ্ন ঘাঁটতে ঘাঁটতে ডাল্টন পৌঁছে গেলেন সেই ভাবনায়, যা তাঁকে অমর করে রাখল। ১৮০৩ সালে প্রথম এঁকে ধরা সেই মতবাদ ১৮০৮ সালে গ্রন্থাকারে বেরোলো — A New System of Chemical Philosophy। মূল কথা ক’টি: প্রতিটি মৌল গঠিত অতি ক্ষুদ্র অবিভাজ্য পরমাণু থেকে; এক মৌলের সব পরমাণুর ভর ও স্বভাব একই; যৌগ মানে পূর্ণ সংখ্যার অনুপাতে জোড়া বাঁধা পরমাণু; আর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরমাণু কেবল নতুন করে সাজে — সৃষ্টি হয় না, ধ্বংসও হয় না। হাইড্রোজেনকে একক ধরে তিনি প্রকাশ করলেন আপেক্ষিক পারমাণবিক ভরের প্রথম ছক, আঁকলেন মৌলের বৃত্তাকার প্রতীক — আজকের H, O, He-এর পূর্বপুরুষ। অনেক সংখ্যাই ভুল ছিল — পানিকে তিনি লিখতেন HO — তবু মূল ভাবনাটি ছিল ভাঙা অসম্ভব।
সম্মান এল দেরিতে, আর তাতে তাঁর খুশি ছিল না বিশেষ: রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হলেন মাত্র ১৮২২ সালে, ফরাসি অ্যাকাডেমির বিদেশি সদস্য ১৮৩০ সালে। ১৮৪৪ সালের ২৭ জুলাই ম্যানচেস্টারে মারা গেলে শহর তাঁকে দিল রাষ্ট্রীয় সমারোহের মতো বিদায় — রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল হাজার হাজার মানুষ। যে তাঁতির ছেলে কোনোদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজার সামনে দাঁড়াতে পারেনি, সে-ই বিজ্ঞানকে উপহার দিল তার ক্ষুদ্রতম নায়ককে — পরমাণু।
“সৌরজগতে নতুন একটি গ্রহ ঢোকানো যেমন অসম্ভব, আগে থেকে থাকা কোনো গ্রহকে মুছে ফেলাও তেমনই — রাসায়নিক ক্রিয়ার হাতে হাইড্রোজেনের একটি কণাও সৃষ্টি বা ধ্বংস হওয়া ঠিক ততটাই অসম্ভব।”
ছাত্রছাত্রীরা আজও কেন নামটা চেনে
রসায়নের যাত্রা শুরু হয় পরমাণু তত্ত্ব থেকেই: তোমার এনসিটিবি বইয়ের মৌল, যৌগ আর রাসায়নিক পরিবর্তনের সংজ্ঞাগুলো আসলে ডাল্টনের সেই স্বীকার্যেরই আধুনিক পোশাক, আর প্রতিটি মৌলের আপেক্ষিক পারমাণবিক ভরের ছক তাঁর প্রথম ছকেরই উত্তরসূরি। রঙ-অন্ধত্বের প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণাও তাঁর হাতের — রোগটির ইংরেজি নাম আজও ডাল্টনিজম। তাঁতির ছেলে, বিশ্ববিদ্যালয়-বঞ্চিত — তবু গোটা পৃথিবীকে শিখিয়ে গেলেন, জড় আসলে কীসে গড়া।
