1834–1907

দিমিত্রি মেন্ডেলিভ

পর্যায় সারণির স্থপতি

দিমিত্রি ইভানোভিচ মেন্ডেলিভ জন্মেছিলেন ১৮৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, সাইবেরিয়ার টোবোলস্ক শহরে — বিশাল এক পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান। বাবা ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক; চোখ নষ্ট হয়ে অল্পদিনেই মারা গেলেন। মা মারিয়া পারিবারিক ছোট্ট কাচের কারখানা চালিয়ে সংসার টেনে তুললেন — কিন্তু দিমিত্রির স্কুল-জীবন শেষ হতে না হতেই কারখানাটি পুড়ে গেল। মা তখন ছেলেকে নিয়ে উরাল পেরিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেন, খুঁজতে ছেলের জন্য একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন। মস্কো ফিরিয়ে দিল; সেন্ট পিটার্সবার্গের মেইন পেডাগজিক্যাল ইনস্টিটিউট তাকে আশ্রয় দিল — আর কয়েক মাসের মধ্যেই মা মারা গেলেন। মায়ের সেই যাত্রার মূল্য মেন্ডেলিভ কোনোদিন ভুলেননি।

পড়াশোনা থামাল অসুখে; দক্ষিণে গিয়ে ক্রিমিয়া আর ওদেসায় শিক্ষকতা করলেন, তারপর গবেষণায় গেলেন হাইডেলবার্গে। ১৮৬৭ সাল থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন পড়াতেন মেন্ডেলিভ, আর ১৮৬৮ সালে বসলেন ছাত্রদের জন্য পাঠ্যবই লিখতে — The Principles of Chemistry। সমস্যা একটাই: ৬৩টি আবিষ্কৃত মৌলের মধ্যে কোনো নিয়ম নেই। ১৮৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, দিনের পর দিন তাসের কার্ডের মতো মৌল সাজিয়ে ক্লান্ত হয়ে তিনি স্বপ্নে দেখলেন বলে জানা যায় — এমন এক সারণি, যাতে প্রতিটি মৌল নিজের জায়গায় বসে পড়ছে। ঘুম ভেঙে সেটি লিখে সেই সকালেই পাঠিয়ে দিলেন ছাপাখানায় — বয়স তখন পঁয়ত্রিশ, সেদিনই ছিল চিজ-খামার পরিদর্শনে রওনা হওয়ার কথা।

মৌলের মধ্যে ছন্দ আগেও কেউ কেউ টের পেয়েছিলেন; মেন্ডেলিভ করলেন অনেক বড় কাজ। ছন্দ যেখানে মানুষের অজানা এক মৌলের জায়গা দাবি করল, তিনি সেখানে ফাঁকা ঘর রেখে দিলেন — আর ভবিষ্যদ্বাণী করে দিলেন: ওই মৌলের ভর কত হবে, ঘনত্ব কত, কেমন যৌগ বানাবে। একা-অ্যালুমিনিয়াম, একা-সিলিকন, একা-বোরন। ১৮৭৫ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী লেকোয়া দ্য বোয়াবোদ্রঁ আবিষ্কার করলেন গ্যালিয়াম, মাপলেন ঘনত্ব ৪.৭। মেন্ডেলিভ রাশিয়া থেকে চিঠি লিখলেন — ধাতুটির এক দানা পর্যন্ত যাঁর চোখে পড়েনি — ঘনত্ব হবে প্রায় ৫.৯, আবার মাপো। নতুন করে মাপা হলো: ৫.৯। তারপর স্ক্যান্ডিয়াম (১৮৭৯) আর জার্মেনিয়াম (১৮৮৬) এসে বসে পড়ল তাঁর ফাঁকা ঘরগুলোয় — যেন ক্রসওয়ার্ডের মিলে যাওয়া উত্তর। অন্য রসায়নবিদদের বিশ্বাস করা বহু পারমাণবিক ভর তিনি সংশোধন করলেন; টেলুরিয়াম আর আয়োডিন যখন ভরের ক্রম মানতে চাইল না, তিনি রসায়নের সাক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে জোড়া সাজে দিলেন — সেই ধাঁধার সমাধান পরে দেবে পারমাণবিক সংখ্যা।

১৯০৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সেন্ট পিটার্সবার্গে তাঁর মৃত্যু হলো; শোকযাত্রায় ছাত্ররা হাতে তুলে নিল পর্যায় সারণির কপি। ১৯৫৫ সালে যে বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে ১০১ নম্বর মৌল বানালেন, তাঁরা নাম রাখলেন মেন্ডেলেভিয়াম — তাঁর বানানো সারণিতেই চিরদিনের আসন। ছন্দটি কেন — সেই রহস্যের সমাধান এল তাঁর মৃত্যুর পরে, প্রোটন আর ইলেকট্রন শেলের আবিষ্কারে। তবু ছন্দটিকে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন — আর ছন্দ তাঁকে ঠকায়নি।

“মৌলগুলোকে পারমাণবিক ভর অনুসারে সাজালে তাদের ধর্মের মধ্যে একটি স্পষ্ট পর্যায়বৃত্ত ধারা ফুটে ওঠে।”

— দিমিত্রি মেন্ডেলিভ

ছাত্রছাত্রীরা আজও কেন নামটা চেনে

পৃথিবীর সব পর্যায় সারণি — এই সাইটের হোম পেজের সারণি, তোমার এনসিটিবি নবম-দশম শ্রেণির রসায়ন অধ্যায়ের সারণি — সবই তাঁর আঁকা নকশার হালনাগাদ রূপ। পরে সাজানোর মাপকাঠি বদলে পারমাণবিক ভরের জায়গায় বসল পারমাণবিক সংখ্যা, কিন্তু পর্যায়, গ্রুপ, লিথিয়াম-সোডিয়াম বা ফ্লুরিন-ক্লোরিনের পারিবারিক মিল — সবই তাঁর। ১০১ নম্বর মৌল মেন্ডেলেভিয়াম বহন করছে তাঁর নাম। আর তাঁর গভীরতম শিক্ষাটা যেকোনো ছাত্রছাত্রিই নিতে পারে: সৎ তথ্য যখন জোর দিয়ে বলে এখানে একটা ফাঁক আছে, তখন তথ্যকেই বিশ্বাস করো — তারপর খুঁজে বের করো, ফাঁকটা কে পূরণ করে।