1743–1794

আন্তোয়া লাভোয়াজিয়ে

আধুনিক রসায়নের জনক — রসায়নকে দাঁড়িপাল্লার ওপর তুলে দেওয়া মানুষ

আন্তোয়া-লোরাঁ লাভোয়াজিয়ে জন্মেছিলেন ১৭৪৩ সালের ২৬ অগাস্ট, প্যারিসে — এমন এক ধনী পরিবারে, যারা তাঁকে আইনজীবী বানাতে চেয়েছিল। শিক্ষা শেষে তিনি নীরবে বেছে নিলেন আরেক পথ — বিজ্ঞান। পঁচিশের কাছাকাছি বয়সেই ফ্রান্সের বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সদস্য নির্বাচিত হলেন তিনি। গবেষণার খরচ চালাতে কিনে নিলেন রাজার কর আদায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসরকারি কোম্পানির একটি অংশ — সেই সিদ্ধান্তের টাকায় দাঁড়াল ইউরোপের সেরা ব্যক্তিগত গবেষণাগার, আর একদিন সেই সিদ্ধান্তই তাঁর প্রাণ কেড়ে নেবে। দিন কাটত তাঁর পরীক্ষার মতোই নিয়মমাফিক: সকাল ল্যাবে, বিকেল সরকারি কাজে, সন্ধ্যায় আবার কাচামেজায়। ১৭৭১ সালে বিয়ে করলেন মারি-আন পোলজে-র সঙ্গে; স্ত্রী শিখলেন ইংরেজি, ব্রিটিশ রসায়নবিদদের লেখা অনুবাদ করলেন স্বামীর জন্য, আঁকলেন তাঁর বইয়ের নিখুঁত ছবি — পুরো বিশ বছর এই স্ত্রীই ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠতম সহযোগী।

সেই যুগের সবচেয়ে বড় ধাঁধা ছিল আগুন। জিনিস জ্বলে কেন? বেশির ভাগ রসায়নবিদের উত্তর: জ্বলন্ত পদার্থ নাকি অদৃশ্য এক উপাদান ছেড়ে দেয় — নাম তার ফ্লোজিস্টন। ১৭৭৪ সালে ইংল্যান্ডের জোসেফ প্রিস্টলি প্যারিসে এসে জানালেন, পারদের লাল গুঁড়া গরম করে তিনি এক আশ্চর্য গ্যাস পেয়েছেন, যাতে মোমবাতি ঝকঝক জ্বলে। লাভোয়াজিয়ে পরীক্ষাটি নিজ হাতে নিলেন, সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বাসী যন্ত্র — দাঁড়িপাল্লা। যা ঢোকে সব মাপলেন, যা বেরোয় তাও মাপলেন। সংখ্যাগুলো বলল ভিন্ন গল্প: জ্বলা কোনো বিসর্জন নয়, মিলন — বাতাসের এক গ্যাসের সঙ্গে পদার্থের যুক্তি। গ্যাসটির নাম তিনি দিলেন অক্সিজেন, অর্থ ‘অ্যাসিড-গঠনকারী’; আর হাইড্রোজেন নামটি দিলেন ১৭৮৩ সালে, যখন গণিতজ্ঞ লাপ্লাসের সঙ্গে দেখালেন, হাইড্রোজেন পুড়িয়ে জন্ম নেয় খাঁটি পানি — অর্থাৎ পানি মৌল নয়, যৌগ। বাতাসের যে চার-পঞ্চমাংশ প্রাণ ধরে না, সেটির নাম দিলেন অ্যাজোট — ‘প্রাণহীন’; সেটিই আমাদের নাইট্রোজেন শব্দের পূর্বসূরি। আর বন্ধ পাত্রে তাঁর দাঁড়িপাল্লার দুই পাল্লা সবসময় সমানই থাকত: কিছু সৃষ্টি হয় না, কিছু ধ্বংসও হয় না — পদার্থ কেবল রূপ বদলায়।

বন্ধুদের সঙ্গে মিলে ১৭৮৭ সালে তিনি নতুন রসায়নের ভাষাও গড়লেন — যৌগের যে নামকরণ-পদ্ধতি দাঁড় করালেন, আজও তা-ই পড়া হয়: সালফিউরিক অ্যাসিড, কপার সালফেট। ১৭৮৯ সালে বেরোল Traité élémentaire de chimie — প্রথম আধুনিক রসায়নের পাঠ্যবই, যাতে ৩৩টি সরল পদার্থের তালিকা, যাদের তখনো কেউ ভাঙতে পারেনি: পর্যায় সারণির প্রথম লাজুক খসড়া। তারপর বিপ্লব নিজের সন্তানদেরই গ্রাস করল। কর-কোম্পানির অংশের দায়ে দোষী হয়ে লাভোয়াজিয়ে গিলোটিনের কাছে গেলেন ১৭৯৪ সালের ৮ মে, পঞ্চাশ বছর বয়সে — মৃত্যুকে বরণ করলেন মাপজোকের সেই শান্ত মাথায়। বলা হয়, গণিতজ্ঞ লাগরাঞ্জ শোকে বলেছিলেন — ঠিক সেরকম আরেকটি মাথা পেতে শতাব্দীও যথেষ্ট নয়। ফ্রান্স রসায়নবিদটিকে মেরে ফেলল; কিন্তু তাঁর সত্যটি আর কোনো শক্তি মুছে দিতে পারল না।

“কিছুই নষ্ট হয় না, কিছুই সৃষ্টি হয় না, সবকিছুই রূপান্তরিত হয়।”

— আন্তোয়া লাভোয়াজিয়ে

ছাত্রছাত্রীরা আজও কেন নামটা চেনে

তুমি ক্লাসে যে সমীকরণ ব্যালেন্স করো, তার প্রতিটিই আসলে লাভোয়াজিয়ের উদ্ধৃতি: বিক্রিয়কের ভর আর উৎপাদের ভর সমান, কারণ পরমাণু কেবল নতুন করে সাজে। দাঁড়িপাল্লাকে তিনি রসায়নের চিরায়ত যন্ত্র বানালেন; অক্সিজেন-হাইড্রোজেনের নামকরণ তাঁর হাতে; সরল পদার্থের প্রথম আধুনিক তালিকা থেকেই একদিন পর্যায় সারণি গজিয়ে উঠেছে। রাসায়নিক বিক্রিয়ার অধ্যায় আজও শুরু হয় তাঁর সেই সূত্র দিয়েই — আর তাঁর পদ্ধতিটাও শেখার মতো: মাপো, সন্দেহ করো, আবার মাপো।