
অক্সিজেন (O)
“শ্বাস নাও: এই মুহূর্তে বাতাসের প্রতি পাঁচ অণুর একটি তোমার ভেতরে ঢুকলো — অস্থির এই মৌলই খাদ্যকে করে শক্তি, লোহাকে ধরায় মরচে, স্ফুলিঙ্গকে করে আগুন।”
ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো
আউফবাউ নীতি থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবের পরিচিত ব্যতিক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়।
নোটগুলো
বৈশিষ্ট্য
- মহা-সংযোগী: প্রায় প্রতিটি মৌলের সঙ্গেই অক্সিজেন মিলে যায় — ধাতুতে পড়ে ম্লান ভাব, লোহায় মরচে, কাঠে আগুন — আর অক্সাইড হতে হতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শক্তি ছেড়ে দেয়।
- নিজে জ্বালানি নয়, তবু আগুনের প্রাণ: জ্বলন্ত খোঁয়া খাঁটি অক্সিজেনের জারে ঢোকালে সঙ্গে সঙ্গে ঝলসে ওঠে — গবেষণাগারে গ্যাস চেনার চিরকালীন পরীক্ষা এটি; অথচ শুধু অক্সিজেনের জার নিজে নিজে কখনো জ্বলে না।
- বিন্যাস 1s² 2s² 2p⁴: পূর্ণ বাইরের খোলের ঠিক দুই ধাপ আগে, তাই অক্সিজেন পরমাণু লোভের সঙ্গে দুটি ইলেকট্রন গ্রহণ বা ভাগ করে নেয় — হয় O²⁻ অক্সাইড আয়ন, নয়তো জোড়া সমযোজী বন্ধন।
- মানবদেহের ভরের প্রায় ৬৫ শতাংশই অক্সিজেন — বেশির ভাগই পানি হয়ে — দেহের সর্বাধিক প্রাপ্ত মৌল এটিই; আর সবুজ উদ্ভিদ দিনের পর দিন সালোকসংশ্লেষণে আকাশের সরবরাহ বাজায় রাখে।
বর্ণহীন, গন্ধহীন গ্যাস, বাতাসের প্রায় ২১ শতাংশ; চলে সাধারণত অণু হয়ে — দ্বিবন্ধনে আবদ্ধ দুই পরমাণু। বাতাসের চেয়ে একটু ভারী, আর মাছের শ্বাস চালাতে যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকুই পানিতে দ্রবীভূত হয়। −১৮৩° সেলসিয়াসে জমে ওঠে চোখ ধাঁধানো হালকা-নীল তরল; গ্যাসটিও আবছা, আকাশি-নীল আভা মাখা।
কোথায় দেখা মেলে
✦ ব্যবহার
- চিকিৎসা-অক্সিজেন: হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডের সিলিন্ডার আর পাইপলাইন — নিউমোনিয়া বা কোভিড রোগীরা এগুলো থেকেই প্রাণ ধারণ করেন; আর বাংলাদেশের ওয়েল্ডিং-এর দোকানগুলোও চলে একই চাপানো সিলিন্ডারে।
- অক্সি-অ্যাসিটিলিন ও অক্সি-এলপিজি টর্চ: প্রায় ৩,৫০০° সেলসিয়াসের শিখা — শিপইয়ার্ড, কারখানা বা রাস্তার মেরামত-শেডে ইস্পাতের পাত কুটকুট করে কাটার তাপ।
- ইস্পাত শিল্প: বেসিক অক্সিজেন চুল্লিতে গলিত পিগ আয়রনের ভেতর দিয়ে খাঁটি অক্সিজেন ফুঁকে মিনিট কয়েকেই কার্বন পুড়িয়ে ফেলা হয় — বিশ্বের বেশির ভাগ ইস্পাতের জন্ম এই পথেই।
- রকেট ও জীবন-রক্ষা: রকেটের কেরোসিন পোড়ানোর অক্সিডাইজার হলো তরল অক্সিজেন, আর মহাকাশচারীরা সঙ্গে টানেন অক্সিজেনের ট্যাংক, বাতাসের নয়।
◍ দৈনন্দিন উদাহরণ
- তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাস: ফুসফুস থেকে রক্তে পার হয়ে যায় অক্সিজেন, আর কোষের ভেতরে সে-ই খাদ্য “পুড়িয়ে” ছাড়ে সেই শক্তি, যা তোমাকে বাঁচিয়ে রাখে।
- বাংলাদেশের বর্ষার ধারায় ভিজে ওঠার পর লোহার রেলিং বা টিনের চালে ফুটে ওঠা মরচে — লোহার অক্সিজেন আর জলীয় বাষ্পের কাছে হার মানা।
- মাছ নিঃশ্বাস নেয় ফুলকা দিয়ে — পুকুর-নদীর জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনই তাদের জীবনরেখা, তাই দূষিত পুকুরে মাছ দমবন্ধ হয়ে মরে।
ইতিহাস ও নাম
অক্সিজেন আবিষ্কৃত হলো একবার নয়, দুবার। সুইডিশ ওষুধ-ব্যবসায়ী কার্ল ভিলহেল্ম শেলে প্রথমে বানান এটি, ১৭৭১–৭২ নাগাদ, কয়েকটি যৌগ গরম করে — কিন্তু প্রকাশক লেখাটি গুদামে তুলে রাখেন ১৭৭৭ সাল পর্যন্ত। অন্যদিকে ১৭৭৪ সালে ইংল্যান্ডের জোসেফ প্রিস্টলি সূর্যের আলো লেন্সে কেন্দ্রীভূত করে পারদের অক্সাইডে ফেলে এক গ্যাস জড়ো করেন, যার ভেতরে মোমবাতি “অবিশ্বাস্যরকম জোরে” জ্বলে ওঠে। কেউই ধরতে পারেননি হাতে কী আছে: দুজনেই ছিলেন ফ্লজিস্টন তত্ত্বের অনুরাগী। এই “ফ্লজিস্টন-মুক্ত বায়ু” যে প্রকৃত মৌল আর দহনের আসল রহস্য, তা প্রমাণ করলো লাভোয়াজিয়েরের যত্নে মাপা ওজনগুলোই — আর তিনিই নাম দেন অক্সিজেন, “অ্যাসিড-গঠনকারী” — প্রতিটি অ্যাসিডেই নাকি এটি থাকে, এই সৎ ভুল বিশ্বাস থেকে।
কাছাকাছি মৌল
সারণিতে এই মৌলের ঠিক পাশে বসে থাকা মৌলগুলো — প্রায়ই রসায়নে সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
