1867–1934

মারি কুরি

রেডিওঅ্যাক্টিভিটি গবেষণার পথিকৃৎ; পোলোনিয়াম ও রেডিয়ামের আবিষ্কারক

মারি কুরি জন্মেছিলেন ১৮৬৭ সালে ওয়ারসো শহরে, মারিয়া স্কোলোদভস্কা নাম নিয়ে — যখন মানচিত্র থেকে মুছে গেছে পোল্যান্ড, দেশটির জমি শাসন করছিল রাশিয়া। সেখানে মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ, তাই তিনি পড়তেন গোপন “ফ্লাইং ইউনিভার্সিটি”-তে, যার ক্লাস পুলিশের নাগাল এড়াতে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে ঘুরে বেড়াত। বোনের প্যারিসে পড়ার খরচ জোগাতে বছরের পর বছর গৃহশিক্ষিকার কাজ করার পর ১৮৯১ সালে এল নিজের পালা — সরবোনে ঠান্ডায় কাঁপানো এক চিলেকোঠার ঘরে থেকে, একবার না খেয়ে ক্লাসেই অজ্ঞান হয়ে পড়েও, তিনি পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম হয়ে স্নাতক হলেন।

১৮৯৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানী পিয়ের কুরির সঙ্গে বিয়ের পর ডক্টরেটের গবেষণার জন্য তিনি বেছে নিলেন ইউরেনিয়াম থেকে বেরিয়ে আসা সেই রহস্যময় রশ্মি, যা অঁরি বেকেরেল আবিষ্কার করেছিলেন আর কেউ ব্যাখ্যা করতে পারেনি। খনিজের পর খনিজ মেপে তিনি দেখালেন, রশ্মির তীব্রতা নির্ভর করে কেবল ইউরেনিয়ামের পরিমাণের ওপর — এটা পরমাণুর নিজস্ব এক ধর্ম, যার নাম তিনি দিলেন রেডিওঅ্যাক্টিভিটি। লক্ষ করলেন, পিচব্লেন্ড আকরিক তার ভেতরের ইউরেনিয়ামের হিসাবের চেয়েও বেশি সক্রিয় — মানে ভেতরে লুকিয়ে আছে অজানা মৌল। পিয়েরের সঙ্গে ছাদ-ফুটো এক বাগান-ঘরে বসে টনের পর টন আকরিক সেদ্ধ করে ১৮৯৮ সালে বের করে আনলেন দুটি নতুন মৌল: পোলোনিয়াম — পদলিত মাতৃভূমির নামে, আর রেডিয়াম। ১৯০৩ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল তাঁকে করে তুলল ইতিহাসের প্রথম নারী নোবেলজয়ী। ১৯০৬ সালে ঘোড়ার গাড়ির চাকার নিচে পিয়েরের মৃত্যু হলে তিনি গ্রহণ করলেন স্বামীর চেয়ার — হলেন সরবোনের প্রথম নারী অধ্যাপক; আর ১৯১১ সালে পেলেন দ্বিতীয় নোবেল, এবার রসায়নে, পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম আবিষ্কার এবং রেডিয়ামকে বিশুদ্ধ করে আলাদা করার জন্য — দুটি ভিন্ন বিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া আজও একমাত্র মানুষ তিনিই।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি দেখলেন, হাসপাতালের বিরল বিলাস এক্স-রে যন্ত্রগুলো আহতের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে বহু প্রাণ বাঁচবে। নিজে গাড়ি চালানো আর মেরামতির কাজ শিখে তিনি বানালেন ভ্রাম্যমাণ এক্স-রে গাড়ির বহর — আনুমানিক বিশটি গাড়ি আর প্রায় ১৫০ জন প্রশিক্ষিত নারী পরিচালক তিনি নামিয়ে দিলেন রণাঙ্গনে, সৈনিকরা যেগুলোর ডাকনাম দিল পেতিত কুরি মানে “ছোট্ট কুরি”; আর যুদ্ধের খাতিরে নোবেল পদক গলিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবটি ব্যাংক ভদ্রভাবেই ফিরিয়ে দিয়েছিল। জীবনের কাজের বিল ১৯৩৪ সালে এসে হাজির হলো: রক্ষাহীনভাবে রেডিয়াম নিয়ে দশকের পর দশক কাজ করার ফলে অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ায় তাঁর মৃত্যু হলো — নমুনার নল তিনি পকেটেই বহন করতেন। তাঁর খাতাগুলো আজও তেজস্ক্রিয়: ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে সেগুলো রাখা হয় সীসায় মোড়া বাক্সে, পড়তে চাইলে স্বাক্ষর করতে হয় নিরাপত্তার ঘোষণায়। পরের বছরই মেয়ে ইরেন জোলিও-কুরি পেলেন রসায়নের নোবেল — কুরিরা হয়ে উঠল বিজ্ঞানের সবচেয়ে পুরস্কৃত পরিবার।

“জীবনে কিছুই ভয়ের নয় — বুঝে নেওয়ারই।”

— মারি কুরি

ছাত্রছাত্রীরা আজও কেন নামটা চেনে

রেডিওঅ্যাক্টিভিটির যে অধ্যায়ই তুমি খোলো না কেন, শুরুটা তাঁর দেওয়া শব্দে; আর রেডিওথেরাপিতে যত ক্যান্সারের চিকিৎসা হয়, সেই রাস্তাটাও তাঁর গড়া। তিনি প্রথম নারী নোবেলজয়ী, সরবোনের প্রথম নারী অধ্যাপক, আর দুটি ভিন্ন বিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া আজও একমাত্র মানুষ। ৯৬ নম্বর মৌল কুরিয়াম বহন করছে পরিবারের নাম, তাঁর প্যারিসের ইনস্টিটিউট আজও রোগী দেখে। বিজ্ঞান কি মেয়েদের জন্য? — এই প্রশ্নের জবাব হিসেবে যুগের পর যুগ দাঁড়িয়ে থাকবেন মারি কুরি।