1861–1944

প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

ভারতীয় রসায়নের জনক — খুলনার সন্তান, ছাত্রদের সেবক

প্রফুল্ল চন্দ্র রায় জন্মেছেন ১৮৬১ সালের ২ অগাস্ট, রারুলি-কাটিয়া গ্রামে — আজকের বাংলাদেশের খুলনা জেলায়, তখনকার অবিভক্ত বাংলায়। বাবা হরিশ চন্দ্র রায় জমিদার হয়েও জ্ঞানকে ভালোবাসতেন বেশি; বাড়িতে গড়লেন লাইব্রেরি, গ্রামে খুললেন মেয়েদের প্রথম স্কুল — নিজের স্ত্রীকে বসালেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে। মেধাবী কিন্তু অসুস্থ প্রফুল্ল কৈশোরে দুই নীরব বছর কাটালেন গ্রামে, বাবার বইয়ের পাল্লায়। কলকাতায় পড়লেন বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে; প্রেসিডেন্সি কলেজে পেডলারের রসায়নের ক্লাসে বসে ভেতরে জ্বলে উঠলেন আগুন। বাড়িতে বানালেন ছোট্ট ল্যাবরেটরি; নিজ হাতের এক যন্ত্র বিস্ফোরিত হলে নতুন করে বানিয়ে নিলেন — রসায়নই হবে জীবন, কারণ দেশের ভবিষ্যৎ গড়া হবে বিজ্ঞানের ওপরেই।

১৮৮২ সালে গিলক্রিস্ট স্কলারশিপ জিতে এডিনবরা গেলেন; ১৮৮৫-তে বি-এসসি, ১৮৮৭-এ ডক্টরেট, পরের বছরই দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়নের সহকারী অধ্যাপক হলেন — যখন ঔপনিবেশিক শাসন ভারতীয়দের বিজ্ঞানের উঁচু আসন দিত না। তাই নিজের স্কুলই গড়লেন। ১৮৯৬ সালে, কলেজের সাদামাটা ল্যাবরেটরিতে, খেয়াল করলেন পৃথিবীর কেউই যা খেয়াল করেনি: লঘু নাইট্রিক অ্যাসিডের সঙ্গে পারদ বিক্রিয়া করলে পিছনে রেখে যায় হলুদ স্ফটিক কঠিন পদার্থ — মার্কারাস নাইট্রাইট, Hg2(NO2)2\mathrm{Hg_{2}(NO_{2})_{2}} — শতাব্দীর পর শতাব্দী যে যৌগ রসায়নবিদদের চোখ এড়িয়ে গেছে। প্রবন্ধটি ছাপা হলো Journal of the Asiatic Society of Bengal-এ; লন্ডনের Nature কয়েক সপ্তাহেই খবরটি ছাপল। আবিষ্কার দিয়ে খুলে গেল নাইট্রাইট গবেষণার গোটা এক স্কুল — যার কারিগর বলে ব্রিটিশ সহকর্মীরা তাঁকে ডাকতেন ‘নাইট্রাইটের মহারথী’।

কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় ল্যাবরেটরি ছিল বাংলা নিজেই। দেশের প্রায় সব ওষুধ তখন আমদানি — এ দৃশ্য দেখে ১৮৯২ সালে মাত্র সাতশো টাকায় শুরু করলেন ভেষজ ওষুধের ছোট্ট কারখানা — যেটি ১৯০১ সালে হয়ে উঠল বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস, ভারতের প্রথম ওষুধ কোম্পানি, আজও চলছে। সংস্কৃত পুঁথি ঘেঁটে লিখলেন History of Hindu Chemistry; ১৯১৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স কলেজের প্রথম পালিত প্রফেসর হলেন — তাঁর ক্লাসে বসতেন মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসুরা।

সম্মান এল একের পর এক — ১৯১৯ সালে নাইট উপাধি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি সাম্মানিক ডি-এস-সি — আর তিনি দিয়ে গেলেন সব কিছু। সারাজীবন ভাড়া বাসায় থেকেছেন; ষাটতম জন্মদিনে, ১৯২১ সালে, গোটা বেতন চিরস্থায়ীভাবে দান করে দিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে। মাসের পর মাস বেতন ঢালতেন গরিব ছাত্রদের ফি-বই-খাওয়ায়, বাংলার বন্যা-দুর্ভিক্ষের ত্রাণে। আজীবন অবিবাহিত; আত্মজীবনী Life and Experiences of a Bengali Chemist উৎসর্গ করলেন তরুণদের হাতে। মারা গেলেন ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন, বিরাশিতে। ২০১১ সালে ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি তাঁর স্মৃতিতে বসাল এক কেমিক্যাল ল্যান্ডমার্ক ফলক — ইউরোপের বাইরে তাদের প্রথম।

“সমাজসেবার প্রতি আমারও ছিল এক বিশেষ টান। দুর্ভিক্ষ, বন্যা কিংবা ভূমিকম্পের দুর্দশা আমার হৃদয়ে সহানুভূতির সুর জাগিয়ে তোলে।”

— প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

ছাত্রছাত্রীরা আজও কেন নামটা চেনে

বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রির কাছে রায় সবচেয়ে কাছের মহাজ্যোতিষ্ক। জন্ম খুলনার রারুলিতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি সাম্মানিক ডি-এস-সি, বাগেরহাটের সরকারি পিসি কলেজের নাম — সবখানেই তিনি আজও বেঁচে আছেন; বেঙ্গল কেমিক্যালস আজও চলছে। ল্যাবে তুমি তাঁর মৌলদের দেখা পাবে — মার্কারাস নাইট্রাইটের পারদ (Hg), আর নাইট্রাইট গ্রুপের নাইট্রোজেন (N)। কিন্তু তাঁর আসল উত্তরাধিকার একটাই ভাবনা: জ্ঞান তখনই পূর্ণ, যখন তা দাঁড়ায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের মানুষের পাশে।