জে. জে. থমসন
ইলেকট্রনের আবিষ্কারক — যিনি অভেদ্য ভাবা পরমাণুকে ভেঙে দেখিয়েছিলেন
জোসেফ জন থমসন জন্মেছিলেন ১৮৫৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর, ম্যানচেস্টারে — এক বইবিক্রেতার সংসারে। ছেলের বয়স ষোলো পেরোতেই বাবা মারা গেলেন; ইঞ্জিনিয়ার বানানোর প্ল্যান ভেস্তে গেল টাকার অভাবে; চৌদ্দ বছর বয়সে তাই ভর্তি হলেন ওয়েন্স কলেজে, কুড়িতে স্কলারশিপ নিয়ে কেমব্রিজের ট্রিনিটিতে। আর ১৮৮৪ সালে, সবাইকে চমকে দিয়ে, আটাশ বছরের এই তরুণকেই বেছে নেওয়া হলো ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরির অধ্যাপক হিসেবে, পেছনে ফেলে বয়স্ক প্রার্থীরা। হাতের কাজে তিনি ছিলেন খ্যাতনামা অগোছালো — যন্ত্রপাতি বানাত ছাত্ররা, প্রশ্ন জোগাতেন তিনি। প্রতিভার সে যেন নিখুঁত ভাগাভাগি ছিল।
১৮৯০-এর দশকে ক্যাভেন্ডিশ মুখর হয়ে উঠল এক রহস্য নিয়ে — ক্যাথোড রশ্মি: প্রায় শূন্য করে দেওয়া কাচের নল দিয়ে বিদ্যুৎ চালনার সময় যে ভুতুড়ে সবুজ আভা ছুটে যায়। জার্মানরা বলছিলেন এ ঢেউ; হার্ট্স বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে বাঁকাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। থমসনের বেশি-শূন্য নলে রশ্মি বেঁকে গেল: এরা বহন করছে ঋণাত্মক আধান। তারপর এল ১৮৯৭ সালের মাপামাপি। বিদ্যুৎ আর চুম্বক — দুই ক্ষেত্র মিলিয়ে রশ্মি বাঁকিয়ে তিনি বের করলেন এদের আধান ও ভরের অনুপাত। ক্যাথোড যে ধাতুরই হোক, নলে যে গ্যাসই থাকুক, উত্তর কাঁপল না — আর সেই মান বলছিল, কণাগুলোর ভর সবচেয়ে ছোট পরমাণু হাইড্রোজেনের প্রায় এক হাজার ভাগের এক ভাগ। ১৮৯৭ সালের ৩০ এপ্রিল রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে ঘোষণা করলেন থমসন: এ পদার্থের একেবারে নতুন অবস্থা — যে উপাদান থেকে সব রাসায়নিক মৌল গড়ে ওঠে। কণাটির নাম সারা পৃথিবী রাখল ইলেকট্রন — স্টোনি বানিয়ে রাখা সেই নাম।
ডাল্টনের পর থেকে অভেদ্য ভাবা পরমাণুর ভেতরে আলাদা অংশ আছে — এই বুঝেই থমসন এঁকে দিলেন তাঁর বিখ্যাত ছবি: ধনাত্মক আধানের গোলক, তাতে পুডিংয়ের ভেতরের বেরির মতো ছড়িয়ে থাকা ইলেকট্রন — ইতিহাসে যা খ্যাত প্লাম-পুডিং মডেল নামে। মডেলটি ভুল ছিল, আর ভুলটি ধরলেন তাঁরই ছাত্র: ১৯১১ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের সোনার পাতার পরীক্ষায় বেরিয়ে এল পরমাণুর কেন্দ্রের ছোট্ট নিউক্লিয়াস; থমসন সংশোধনটিকে সাদরে নিলেন। গ্যাসে বিদ্যুৎ পরিবহনের গবেষণার জন্য তিনি পেলেন ১৯০৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল, ১৯০৮ সালে নাইট উপাধি। ১৯১৩ সালে ধনাত্মক রশ্মি ঘেঁটে দেখলেন নিয়ন ভাগ হয়ে যাচ্ছে দুই ভরে — নিয়ন-২০ আর নিয়ন-২২: আইসোটোপের প্রথম ঝলক, যে ক্ষেত্রের মানচিত্র আঁকবে তাঁরই ছাত্র ফ্রান্সিস অ্যাস্টনের ভর-স্পেকট্রোমিটার। তাঁর হাতেই ক্যাভেন্ডিশ হয়ে উঠল আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের নার্সারি — রাদারফোর্ড, উইলসন, অ্যাস্টনেরা বেরিয়ে এলেন সেখান থেকে। নিজের ছেলে জি. পি. থমসন ১৯৩৭ সালে নোবেল পেলেন দেখিয়ে — ইলেকট্রন ঢেউয়ের মতোও আচরণ করে। বাবা প্রমাণ করলেন ইলেকট্রন একটি কণা, ছেলে প্রমাণ করলেন সে-ই এক ঢেউ। ১৯৪০ সালে মারা যান জে. জে.; শেষ শয্যা ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে, নিউটনের কাছেই।
“ক্যাথোড রশ্মিতে আমরা পেয়েছি পদার্থের এক নতুন অবস্থা… এই পদার্থই সেই উপাদান, যা থেকে সব রাসায়নিক মৌল গড়ে ওঠে।”
ছাত্রছাত্রীরা আজও কেন নামটা চেনে
পরমাণুর যে টুকরো সবার আগে খুঁজে পাওয়া গেল, সেই ইলেকট্রনের আবিষ্কারক থমসন। এই সাইটের প্রতিটি মৌলের পাতায় তুমি যে ইলেকট্রন বিন্যাস পড়ো, তা তাঁর কাজেরই সরাসরি ধারাবাহিকতা। তাঁর নিয়ন-রেখার ঝলক থেকে জন্ম নিল আইসোটোপ-বিজ্ঞান — কার্বন ডেটিং থেকে চিকিৎসার তেজস্ক্রিয় ট্রেসার, সবই তারই ফসল। ইলেকট্রনের আচরণের গল্পই আজ রাসায়নিক বন্ধন, বজ্রপাত আর তোমার হাতের প্রতিটি সার্কিট। এনসিটিবি ছাত্রছাত্রির কাছে তিনি পরমাণুর গঠন অধ্যায়ের প্রথম মানুষ — যিনি আগে দেখালেন, পরমাণুর ভেতরেও আলাদা জিনিস আছে।
