
লোহা (Fe)
“সভ্যতাকে গড়তে শেখানো ধাতু — আর তোমার রক্তে ভেসে বেড়ানো সেই পরমাণু, যে প্রতিটি নিঃশ্বাসের অক্সিজেন ফুসফুস থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।”
ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো
আউফবাউ নীতি থেকে গণনা করা হয়, বাস্তবের পরিচিত ব্যতিক্রমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়।
নোটগুলো
বৈশিষ্ট্য
- ইলেকট্রন বিন্যাস [Ar] 3d⁶ 4s² — পর্যায় ৪-এর গ্রুপ ৮-এর d-ব্লক স্থানান্তর ধাতু; দুটি 4s ইলেকট্রন (বা তার সঙ্গে আরেকটি 3d) ছাড়লেই পাওয়া যায় সবুজ ও বাদামি লবণের পরিচিত Fe²⁺ আর Fe³⁺ আয়ন।
- অক্সিজেন আর আর্দ্রতা একসঙ্গে আক্রমণ করলেই মরিচা ধরে: ভেজা বাতাস একে গড়ে দেয় খোসার মতো কমলা-বাদামি ·x দিয়ে — লবণ আর অ্যাসিড ধ্বংস ত্বরান্বিত করে, তাই জাহাজ আর সমুদ্রতীরের রেলিং সবার আগে ক্ষয়ে যায়।
- কোবাল্ট আর নিকেলের সঙ্গে মিলে মাত্র তিন মৌলের একটি — যারা কক্ষ তাপমাত্রাতেই প্রবলভাবে চুম্বকীয়; ৭৭০ °C-এর ওপরে গরম করলে চুম্বকত্ব মিলিয়ে যায়।
- প্রাচুর্যে বিস্ময়কর — পৃথিবীর কেন্দ্রের বেশির ভাগই লোহা-নিকেল, আর সেই গলিত লোহার ঘূর্ণিই জাগিয়ে রাখে পৃথিবীর চুম্বকক্ষেত্র; ভূত্বকেয় লোহা অ্যালুমিনিয়ামের পরেই দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রাপ্ত ধাতু।
রুপালি-ধূসর ধাতু — নতুন কাটা বা ঘষা তলে ঝকঝকে দ্যুতি, তবে আর্দ্র বাতাসে তা শিগগিরই মলিন হয়ে যায়। খাঁটি লোহা আশ্চর্যরকম নরম ও সহজে চুম্বকিত হয়; মিশ্রিত কার্বনই ওকে কঠিন ইস্পাতে বদলে দেয় — যে মজবুত রূপে তুমি সবসময় এর দেখা পাও।
কোথায় দেখা মেলে
✦ ব্যবহার
- কংক্রিটকে শক্ত করা — গ্রামের ঘর থেকে পদ্মা সেতু, বাংলাদেশের প্রতিটি আরসিসি পিলার, বিম আর ছাদ ঢালা হয় ইস্পাতের রডের কঙ্কালের ওপর; কারণ কংক্রিট চাপ সামলায়, টান সামলাতে পারে না।
- স্টেইনলেস স্টিল — প্রায় ১৮% ক্রোমিয়াম আর ৮% নিকেল মেশানো লোহার এই মিশ্র ধাতু দিয়েই তৈরি হয় মরিচামুক্ত চামচ, সিংক, হাসপাতালের যন্ত্রপাতি আর পানির ট্যাংক।
- রেললাইন, জাহাজের পাত, গার্ডার আর কৃষি যন্ত্রপাতি — নানা গ্রেডের ইস্পাত আজও বিপুল ব্যবধানে পৃথিবীর সর্বাধিক ব্যবহৃত ধাতু।
- আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট — রক্তে অক্সিজেন বহনকারী হিমোগ্লোবিন প্রোটিনের মূল উপাদান লোহা, তাই বাংলাদেশের স্কুল স্বাস্থ্য কর্মসূচি কিশোরীদের সাপ্তাহিক আয়রন ট্যাবলেট দেয়।
◍ দৈনন্দিন উদাহরণ
- তোমার শরীরের এক ফোঁটা রক্ত — এর কোটি কোটি লোহিত কণিকার প্রতিটিতেই প্রায় ২৭ কোটি হিমোগ্লোবিন অণু, আর প্রতিটি অণু গড়া একেকটি লোহার পরমাণুকে কেন্দ্র করে।
- অসম্পূর্ণ দালানের রড, লেভেল ক্রসিংয়ের রেললাইন আর রান্নাঘরের কড়াই — আলাদা আলাদা কাঠিন্যের তিন রকম লোহা।
- পালং শাক, ডাল আর খেজুর — বাঙালির থালার ডাল-শাকই পূরণ করে দেহের প্রতিদিন হারানো কয়েক মিলিগ্রাম লোহা।
ইতিহাস ও নাম
নিত্যব্যবহার্য ধাতুদের মধ্যে লোহাই একমাত্র যার কোনো আবিষ্কারক নেই: গলানোর কৌশল জানার অনেক আগেই মানুষ উল্কাপিণ্ডের কালো লোহার দলা কুড়িয়ে পেটিয়ে তা দিয়ে পুঁতি আর ছুরি বানাত — তুতানখামেনের প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরোনো ছুরির ফলাটি এসেছিল আকাশ থেকেই। প্রায় ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মধ্যপ্রাচ্যের কামাররা কাঠকয়লার আগুনে আকরিক থেকে লোহা গলিয়ে আলাদা করতে শেখেন, আর এই সস্তা মজবুত ধাতু ব্রোঞ্জ যুগ শেষ করে পরবর্তী যুগের নামই দান করে — লৌহ যুগ। ইংরেজি নামটি এসেছে প্রাচীন ইংরেজি īsern থেকে, কিন্তু সারা পৃথিবীর রসায়নবিদরা লেখেন Fe — ল্যাটিন ferrum থেকে। লাঙলের ফাল থেকে আধুনিক দালানের রড — এমন সব বিপ্লবই এই ধাতু গলানো শেখার ফল।
কাছাকাছি মৌল
সারণিতে এই মৌলের ঠিক পাশে বসে থাকা মৌলগুলো — প্রায়ই রসায়নে সবচেয়ে কাছের আত্মীয়।
