মুষলধারে বৃষ্টির পরদিন সকালে বদ্বীপের বুকে — ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, জামালপুর — পাটখেতের কিনারে দাঁড়ালে দেখবে, যে কৃষক বীজ বুনেছিল তার চেয়েও লম্বা গাছ; পাতায় পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটা সবুজ লণ্ঠনের মতো ঝিলিক দিচ্ছে। ক’দিন পরেই সেই চারা কাটা হবে, আঁট বাঁধা হবে, আর গ্রামের পুকুরে ডুবিয়ে রাখা হবে — ধীরে ধীরে পানি কালচে হবে, গ্রামভরা ভেসে থাকবে সেই চেনা গন্ধে। আমরা বলি সোনালি আঁশ। রসায়নবিদ দেখেন আরও সুন্দর কিছু: রোদ, বাতাস আর পানি — সব মিলে গাঁথা দড়ি।
তিন মৌল, রোদের তাঁতে বোনা
পাটের এক সুতো আলোর দিকে তুলে ধরলে যা দেখছ, তা সেলুলোজ — এক একটা পলিমার, অর্থাৎ একই কড়ি হাজার হাজার বার নকল হয়ে সাজানো বিশাল অণু। প্রতিটা কড়ি একেকটা গ্লুকোজ একক, গাছ যা গড়েছে নিছক তিন মৌল দিয়ে: কার্বন (C), হাইড্রোজেন (H) আর অক্সিজেন (O)। গাছের তাঁত হলো সালোকসংশ্লেষ — বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড আর পানি, রোদের শক্তিতে বোনা হয় চিনি, তারপর সেটাই পাকানো হয় আঁশে। সেলুলোজের শিকলের ফাঁকে থাকে লিগনিন — চারাকে সোজা দাঁড় করিয়ে রাখা প্রাকৃতিক আঠা, যে যৌগের পরিবার কাঠকে কঠিন করে।
পাটের আঁশের কিংবদন্তি-খ্যাতি টান সামলানোর ক্ষমতা আসলে অণু-স্থাপত্যের গুণ। প্রতিটা সেলুলোজ শিকলে গ্লুকোজ এককগুলো আটকে থাকে সমযোজী বন্ধনে — ইলেকট্রন ভাগ করে নেওয়ার সম্পর্ক, ভাঙতে চাই ভীষণ শক্তি — আর পাশাপাশি শিকলগুলো নিজেদের মধ্যে আঁটকে আঁটকে সাজে তারের মতো। এ জন্যই ওজন ধরে হিসেব করলে পাটের বস্তা অনেক কৃত্রিম দড়ির চেয়েও বেশি টান সহে: তুমি টানাটানি করছ অসংখ্য রাসায়নিক বন্ধনের মিলিত শক্তির সঙ্গে, যারা সবাই এক দিকে সারিবদ্ধ।
পাট পচে যায় কেন, পলিথিন পচে না কেন
পাটের ব্যাগ বর্ষার জলে ফেলে রাখো — সপ্তাহ খানেকেই নরম হয়, কালো হয়, ছিঁড়ে যায়: শিকলের ফাঁকে পানি ঢোকে, আর মাটির অণুজীব — ছত্রাক আর ব্যাকটেরিয়া — হাজির হয় কোটি বছরের অভিজ্ঞতায় ঘষা এনজাইম হাতে, কারণ গাছ হজম করাই ওদের রুজি। পরমাণুগুলো ফেরে মাটি আর বাতাসে, চক্রটা আবার শুরু হয়। এবার একটা পলিথিনের ব্যাগ ফেলো। ওটাও কার্বন আর হাইড্রোজেনেই গড়া — কিন্তু এর মেরুদণ্ড কৃত্রিম কার্বন-কার্বন শিকল, যা কাটার এনজাইম বাংলাদেশের কোনো মাটির কোনো অণুজীবের হাতে নেই। একই মৌল, অন্যভাবে সাজানো — ব্যাগটা বেঁচে থাকবে কৃষকের, তার ছেলের, বোধহয় নাতিরও জীবনের পর পর্যন্ত। সোনালি আঁশের পুরো পরিবেশ-যুক্তিটা এখানেই: প্লাস্টিক অন্যরকম পদার্থ বলে নয়, পাট সেই পদার্থ বলেই — যেটা প্রকৃতি ফেরত নিতে জানে।
বস্তার বাইরে
বাংলাদেশ কেবল পাট ব্যবহার করেনি; এই বদ্বীপ পাটেরই এক আবাসভূমি, আর ব্র্যান্ডিং-এর ভাষা আসার অনেক আগে থেকেই সোনালি সুতো এ দেশের সবচেয়ে পরিচিত রপ্তানি ছিল। যে অংশটা আঁশ নয়, সেখানেও রসায়ন: আঁশ ছাড়ানোর পর পড়ে থাকা পাটকাঠি চিপে গুঁড়িয়ে বানানো হয় পার্টিকেল বোর্ড, যেখানে আঠার কাজটাও করে লিগনিন নিজেই; আঁশ যায় বস্তা, চাটাই, সুতা আর কাগজ হয়ে — আর দিন দিন যায় সেই ব্যাগে, যা পৃথিবী প্লাস্টিক ছেড়ে এখন খুঁজছে।
তাহলে আগামী বর্ষায় পুকুরে ডোবানো পাটের গন্ধে নাক চেপে ধরার আগে একবার ভাবো। সেই গন্ধটা আসলে রসায়নের ভাষায় এক ধৈর্যশীল সুর — একটা পলিমার ভাঙা হচ্ছে, যাতে তাকে ব্যবহার করা যায়, আর শেষে সৎভাবে মাটিতে ফেরানো যায়। বাজারের বাহুল্য পদার্থের মধ্যে এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারে এমন মালিক খুব কমই আছে।
