চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে সীতাকুণ্ডের পথে উপকূল ধরে উত্তরে উঠলে সৈকতের চেহারাটা আস্তে আস্তে বদলে যায়। দিগন্তে বালুতে হেলান দিয়ে পড়ে আছে অর্ধেক-খাওয়া জাহাজের সারি — ট্যাংকার, কনটেইনার জাহাজ, বাল্ক ক্যারিয়ার — সারা পৃথিবীর নাবিক-জাতির নৌযানগুলো জীবনের শেষ ভ্রমণটা করে এসেছে বঙ্গোপসাগরের এই কিনারায়। পৃথিবীর অন্যতম বড় জাহাজ-ভাঙা মাঠ এটি, আর প্রতিটি কর্মদিবসে গ্যাস-টর্চ হাতে শ্রমিকেরা ঢুকে পড়ে দৈত্যদের পেটে, ফিরে আসে মৌল-সারণির টুকরো বয়ে নিয়ে।
ভাসমান ধাতুর খনি
রসায়নের চোখে জাহাজ এক ভাসমান খনি। এর বেশির ভাগ ভরই ইস্পাত — লোহা (Fe, পারমাণবিক সংখ্যা ২৬), যাতে কার্বন (C) মেশানো মাত্র হাজারে কয়েক ভাগ। সেই চিমটিই নরম ধাতুকে বানায় জাহাজের হাল: খাঁটি লোহার পরমাণু সাজানো থাকে সুশৃঙ্খল স্তরে, স্তরগুলো পরস্পরের ওপর দিয়ে পিছলে যায় বলেই ধাতুটা বাঁকে, খোঁচা খায়; কার্বনের পরমাণু স্তরের ফাঁকে গেঁথে গিয়ে ওদের শক্ত করে আটকে দেয় — তখনই জন্ম নেয় সেই মিশ্র ধাতু, যার বাঁকানো পাত কয়েক দশক সাগরের ঢেউ বুকে ঠেকিয়ে রাখে।
হালের ভেতরে লুকিয়ে থাকে আরও মৌলের ভাণ্ডার। জাহাজের কিলোমিটার কিলোমিটার বিদ্যুৎ-তার তামার (Cu) — স্রোতকে প্রায় সব ধাতুর চেয়ে মসৃণ পথ দেয় বলেই তাকে টেনে তার করা হয়। নল, ফিটিং আর ঝকঝকে জিনিসের বহু কিছুই পিতল — তামার সঙ্গে দস্তার (Zn) মিশ্রণ, খাঁটি তামার চেয়ে শক্ত আর বেশি সোনালি। ইঞ্জিনরুমের কোণে অপেক্ষায় থাকে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির সারি (Pb) — গন্ধকীয় অ্যাসিডে ডোবা সীসার পাত, জাহাজের জরুরি বিদ্যুতের ভাণ্ডার। জাহাজটাকে সৎভাবে খুলে সাজালে যেন মৌল-সারণির এক কোণ বেরিয়ে আসে।
টর্চের শিখা: দ্রুতগতির দহন
এত ইস্পাত কেটে আলাদা করাটা আসলে দহন-রসায়নের প্রয়োগ। আগে জ্বালানি গ্যাসের শিখা ধাতুকে লাল-গরম করে তোলে; তারপর কাটারি ছোড়ে খাঁটি অক্সিজেনের ঝাঁক, আর লোহা সেখানে সত্যিই জ্বলে ওঠে। + → বিক্রিয়ায় অক্সিজেন গরম লোহার ইলেকট্রন ছিনিয়ে নিয়ে ছড়ায় ভীষণ তাপ, আর গ্যাসের ধাক্কায় গলিত অক্সাইড কাটা রেখা বেয়ে বেরিয়ে যায় — সেন্টিমিটার পুরু ইস্পাতে খুলে যায় সরু নালা। বর্ষার ঘরে পড়ে থাকা তোমার সাইকেলের চেইন যেমন মাসের পর মাস ধরে মরিচা খায়, টর্চের শিখায় সেই একই ইলেকট্রন-ছিনতাই ঘটে মাত্র এক সেকেন্ডে। মরিচা যেন ধীর আগুন, আর টর্চ তারই দ্রুতগতি রূপ।
লবণ আর দ্বিতীয় জন্ম
যে পাতগুলোকে ত্রিশ বছর সাগর মেনে নিয়েছিল, ডাঙায় পড়েই সাগর দেরি করে না। লোনা বাতাস মরিচার আপন বন্ধু: সমুদ্রের ঝাপটার ক্লোরাইড আয়ন ধাতুর গায়ের পাতলা অক্সাইড আস্তরণ ভেঙে দেয়, তাই মাঠে পড়ে থাকা পাত সাগরে থাকার চেয়েও দ্রুত ক্ষয়ে যায়। তবু গল্পের শেষটা ভালো। পাতগুলো বিক্রি হয়ে চলে যায় শহর ঘিরে থাকা রি-রোলিং মিলে, গলে আবার রড আর শিট হয়ে ওঠে — সেই পুরোনো পরমাণুরাই নতুন দালানের হাড়ে দ্বিতীয় জীবন পায়।
কাজটা কঠিন, বিপজ্জনক বলেই খ্যাত; আর যে রসায়ন এই শিল্পকে মূল্যবান করে, সেটাই বিপদটারও ব্যাখ্যা — জ্বলন্ত ধাতু, ব্যাটারির অ্যাসিড, জাহাজের পেটে রয়ে যাওয়া জ্বালানি। কিন্তু এটি পৃথিবীর বড় রিসাইক্লিং-গল্পগুলোরও একটি। বাংলাদেশের কোনো অসম্পূর্ণ দালানে হয়তো একটা রড আজও ছাদ ধরে আছে এমন পরমাণু দিয়ে, যারা একদিন প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে এসেছিল। পরমাণুরা সেই সফর মনে রাখে না; ওরা কাজ চালিয়ে যায়।
