ঈদের চাঁদ দেখা গেছে, কিংবা পাড়ার বিয়েবাড়িতে বাজনা বাজছে — আর আকাশ ভেঙে পড়ল এ মুহূর্তে: মাথার ওপরে খুলে গেল চাঁদাবাদি — এক গুচ্ছ টকটকে লাল, তারপর সবুজের বৃষ্টি, তারপর রুপালি ঝাড়বাতি যা ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে যায়। ভিড় হাঁ হয়ে যায় সৌন্দর্যে। এই গল্প পড়ার পর তুমিও হাঁ হয়ে যাবে, তবে আরেকটা কারণে: এ কোনো অভিনয় নয় — পর্যায় সারণিই জ্বলছে সরাসরি, আর তুমি রসায়নবিদের মতো রংগুলো পড়ে ফেলতে পারবে।
মৌলের রঙের প্যালেট
আতশবাজির প্রতিটি রং এক মৌলের সই। সোডিয়াম আঁকে সেই উষ্ণ সোনালি-হলুদ, যা পুরোনো রাস্তার বাতির আলোতে তুমি চেনো। স্ট্রনশিয়াম দেয় গাঢ় টকটকে লাল। বেরিয়াম জ্বলে ঝরঝরে আপেল-সবুজ। তামা ছুঁড়ে দেয় নীলচে-সবুজ আলো। ম্যাগনেসিয়াম ফুটে ওঠে চোখ-ধাঁধানো সাদায়, আর অ্যালুমিনিয়াম ফাটিয়ে ওঠে রুপালি-সাদা স্ফুলিঙ্গে — হাতে ধরা স্পার্কলারের ঝিলিক মূলত এই ধাতুরই গুঁড়ার জ্বালা। কোনো রং নেই, রঞ্জক নেই — শুধু পরমাণু, এমন সব গরম করা যে ওরা নিজের নাম রঙে লিখে স্বীকার করে।
তাপ যখন রং বানায়
যন্ত্রটা সবচেয়ে মনোরম। শিখার তাপ ধাতুর পরমাণুর একটা ইলেকট্রনকে ছুঁড়ে দেয় ওপরের শেলে — উত্তেজিত অবস্থায়; এক মুহূর্ত থেমে ইলেকট্রনটা আবার নেমে পড়ে। পড়ার ঝাপটায় ছুটে বেরোয় আলোর এক প্যাকেট, আর যেহেতু প্রতিটি মৌলের শেলগুলো বসে থাকে তার নিজস্ব উচ্চতায়, সেই আলোর রঙও তার নিজস্ব। বোরের পরমাণু-মডেল এই ছবিটাই: শেল যেন সিঁড়ি, ইলেকট্রন ধাপে দাঁড়াতে পারে, ধাপের মাঝখানে নয়। এ জন্যই হাইড্রোজেনের আলো প্রিজমে মসৃণ রামধনু না দেখিয়ে দেখায় ধারালো একটা লাল রেখা আর একটা নীলচে-সবুজ রেখা। প্রতিটি মৌল নিজের উচ্চতার সিঁড়ি, নিজের রঙে জ্বলে।
আতশবাজি, আর গবেষণাগারের সেই একই কসরত
আতশবাজির শেল মানে স্টার নামের কুচি কুচি বড়ির বান্ডিল — ধাতুর লবণ, জ্বালানি আর বাঁধাই-কাঠামো মিশিয়ে গোটানো, মাঝখানে বিস্ফোরক চার্জ। বানানোর কারিগর আসলে আকাশজুড়ে মৌল সাজিয়ে রাখেন। হাতে নেওয়া স্পার্কলারও বাহুর নাগালে সেই একই রসায়ন: আঠায় গাঁথা ধাতুর গুঁড়া আর অক্সিজেন-দাতা যৌগ — প্রতিটি উড়ন্ত স্ফুলিঙ্গ এক দানা জ্বলন্ত অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম কিংবা লোহা। আর রসায়নবিদরা এই কসরত ধরেছিলেন আতশবাজি শিল্প হয়ে ওঠারও আগে: শিখা পরীক্ষা। পরিষ্কার একটা তারে লবণের দ্রবণ মাখিয়ে গরম শিখায় ধরলে ধাতুটা রঙে ফাঁস করে দেয় — সোনালি-হলুদ ঝলক মানেই সোডিয়াম, টকটকে লাল মানেই স্ট্রনশিয়াম, নীলচে-সবুজ মানেই তামা। আতশবাজিই, নাম-মাত্র ল্যাব-বেঞ্চে সাজানো।
আর এ কারণেই আতশবাজির কারিগর আর রসায়নের শিক্ষক দুজনেই দূরত্বের ব্যাপারে জেদি: আলোর উৎসবটা আসলে জ্বলন্ত ধাতু, যে ঝিলিক আকাশে লেখা আঁকে, সেই ঝিলিকই হাত পুড়িয়ে দিতে পারে। বিস্ময়টা রাখো, দূরত্বটাও রাখো।
কাজেই পরেরবার হর্ষধ্বনিতে আকাশটা যখন ফুলে উঠবে, তুমি পড়ে নাও: টকটকে লালটা স্ট্রনশিয়াম নিজের শেলের সিঁড়ি বেয় নেমে পড়ছে, আপেল-সবুজটা বেরিয়াম, সোনালিটা সোডিয়াম, সাদা দাপটটা ম্যাগনেসিয়াম। মহাবিশ্ব নিজের নাম লিখছে আলোয়, মৌলে মৌলে — আর তুমি সেটা পড়তে শিখে গেছ। রসায়ন কোনোদিন উৎসব থেকে বিস্ময় কেড়ে নেয় না; বরং হাতে ধরিয়ে দেয় আরেকটা।
