নিজের হাতটা চোখের সামনে ধরে তুলো। একটা আঙুল চেপে দেখো — গাঁটের ওপর দিয়ে চামড়া কীভাবে চলে যায়, টের পাও — আর একবার ভেবে দেখো, তুমি আসলে ছুঁয়ে দেখছ কাকে: প্রায় সাত ওকটিলিয়ন পরমাণু — সাতের পরে সাতাশটা শূন্য — চামড়া, রক্ত আর হাড়ে সাজানো। পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের সব তারা মিলেও এতটা নয়; আর প্রতিটি পরমাণুই ওই পর্যায় সারণিরই কোনো না কোনো মৌলের — যে সারণি পড়ছ তুমি পরীক্ষার জন্য। আশ্চর্যের ব্যাপার আরেকটা: এত কিছুর মধ্যে কাজে লাগে মাত্র কয়েকটির। তোমার প্রায় পুরো শরীরই গড়া ছোট্ট এক বাজারের ফর্দে।
চার বড় মৌল
ওজনে তুমি প্রায় ৬৫ শতাংশ অক্সিজেন, ১৮ শতাংশ কার্বন, ১০ শতাংশ হাইড্রোজেন আর ৩ শতাংশ নাইট্রোজেন — চারটি মৌলেই তোমার ৯৬ শতাংশ। অক্সিজেন আর হাইড্রোজেনের এই প্রাধান্যে বড় কোনো রহস্য নেই: তুমি আসলে পানির থলে — শরীরের প্রায় ৬০ শতাংশই , তাই ফুসফুস খালি থাকলে দেহ ডুবে যায়, ভরা থাকলে ভেসে ওঠে। আর কেজি নয়, সংখ্যা ধরলে তোমার সবচেয়ে বেশি পরমাণু হাইড্রোজেনেরই — ওজনে ও-ই সবচেয়ে হালকা। কার্বন হলো প্রাণের কাঠামো: কার্বোহাইড্রেট, চর্বি, প্রোটিন, প্রতিটি কোষে পাক খাওয়া DNA — সবই দাঁড়িয়ে আছে কার্বনের খুঁটির ওপর। মাত্র ৩ শতাংশ নাইট্রোজেন, অথচ প্রতিটি প্রোটিনে, জিনের বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষরে তা বোনা — এই জন্যই চাষিরা নাইট্রোজেন সারে এত টাকা ঢালে।
গড়ে তোলার মজুত
এরপর ক্যালসিয়াম, প্রায় ১.৫ শতাংশ, আর ফসফরাস, প্রায় ১.২ শতাংশ। ক্যালসিয়ামের প্রায় সবটাই জমা আছে হাড় আর দাঁতের ভাণ্ডারে — সারা জীবন দেহ ওখানে জমা রাখে, ওখান থেকে ধার তোলে; কিন্তু রক্তে ভাসমান সামান্যটুকু এত জরুরি যে ওটুকু না থাকলে পেশি সংকুচিত হতো না, ক্ষত জমাট বাঁধত না। ফসফরাস বসে আছে DNA-র মেরুদণ্ডে, প্রতিটি কোষঝিল্লিতে, আর ATP-তে — যে অণু খরচ করে দেহ প্রতিটি হৃৎস্পন্দন, প্রতিটি পলকের পর্দা, প্রতিটি ভাবনা চালায়। বাস ধরতে দৌড়াতে গিয়ে তুমি যে শক্তি পোড়াচ্ছ, তার মুদ্রাও ফসফরাসে ঢালাই।
তিন গ্রাম লোহা, আয়োডিনের কানাকড়ি
তারপর ট্রেস মৌলের পালা — ওজনে অণুমাত্র, অভাবে সর্বনাশা। গোটা শরীরে তোমার লোহার মজুত মাত্র তিন গ্রামের মতো, ছোট একটা কয়েনের সমান; অথচ অস্থিমজ্জি প্রতি সেকেন্ডে যে প্রায় দুই মিলিয়ন লোহিত কণিকা গড়ে, তার প্রতিটিই ভরা হিমোগ্লোবিন অণুতে, প্রতিটি অণুর কেন্দ্রে একেকটা লোহার পরমাণু। ওই লোহার আসনেই বসে অক্সিজেন ফুসফুস থেকে পায়ের আঙুল অবধি যাত্রা সারে। আয়োডিন দরকার আরও সূক্ষ্ম পরিমাণে — দিনে দেড়শ মাইক্রোগ্রামের মতো; কিন্তু থাইরয়েড গ্রন্থি ওটা দিয়েই বানায় হরমোন, যারা ঠিক করে দেয় তুমি খাবারকে শক্তিতে কত দ্রুত বদলাবে। আয়োডিন কম পেলে গ্রন্থি ফুলে গলগণ্ড হয় — এই জন্যই রান্নাঘরের নুন আয়োডিন-মেশানো।
সূর্যের চেয়েও প্রবীণ
আর এই ফর্দের মাল এল কোথা থেকে? সবার প্রবীণ হাইড্রোজেন: বিগ ব্যাংয়ের প্রথম মুহূর্তগুলোতে, ১৩৮০ কোটি বছর আগে, ওর প্রোটনগুলো জমা হয়ে গিয়েছিল। তোমার কার্বন আর অক্সিজেন রান্না হয়েছে নক্ষত্রের চুল্লিতে; ক্যালসিয়াম আর ফসফরাসও তাই। লোহার জীবনী সবচেয়ে অদ্ভুত: লোহা পর্যন্ত ফিউশন শক্তি দেয়, লোহার পরে শক্তি গিলে ফেলে — তাই লোহার কেন্দ্র জমতে থাকা মানেই নক্ষত্রের মৃত্যুদণ্ড। তোমার রক্তের প্রতিটি লোহার পরমাণু গড়া হয়েছিল মৃত্যুর পথে হাঁটা এক বিশাল নক্ষত্রের বুকে, তারপর সেই নক্ষত্রকে শেষ করা সুপারনোভা বিস্ফোরণে ছিটকে গেছে ছায়াপথ জুড়ে — সূর্যের জন্মেরও বহু আগে।
আবার হাতের দিকে তাকাও। সারা জীবন তুমি বয়ে বেড়াচ্ছ প্রাচীন আকাশের এক টুকরো — প্রতিটি পরমাণুই মহাবিশ্বের কাছ থেকে ধারে নেওয়া। নক্ষত্রের ধুলোয় গড়া — এ কবিতা নয়, সাদামাটা রসায়ন।
