দৈনন্দিন জীবনের মৌল

তোমার থালায় ঠিক কী আছে? বাঙালি খাবারের মাইক্রোস্কোপিক ভ্রমণ

ভাত, ডাল, শাক আর নুনের থালা আসলে কুড়িয়াখানি মৌলের বিতরণ ব্যবস্থা — রোদ থেকে কার্বন, কড়াই থেকে লোহা, কলা থেকে পটাশিয়াম, নুনের শিশি থেকে আয়োডিন।

রাত আটটা, সামনের থালায় ধোঁয়া-ওঠা ভাতের স্তূপ, কড়াইয়ে নেড়ে-চেড়ে আনা রসনা-গন্ধ ডাল, এক পদ পালং শাক ভাজা, পাশে কোণাকুণি কাটা লেবুর ফালি। মা বলেন, এ রাতের খাওয়া। রসায়নবিদ বলবেন — কুড়িয়াখানি মৌলের বিতরণ ব্যবস্থা: দানা আর পাতায় মুড়িয়ে পাঠানো, গন্তব্য তোমার হাড়, রক্ত আর মগজ। আজ চামচ তোলার আগে একবার খেয়ে দেখো, খাবারটা রসায়নবিদের চোখে।

ভাত: কার্বনের মোড়কে ভাঁজ করা রোদ

ভাতের বেশির ভাগই স্টার্চ, আর স্টার্চ আসলে গ্লুকোজের লম্বা শিকল — প্রতিটি অণু C6H12O6\mathrm{C_{6}H_{12}O_{6}}, গড়া শুধু কার্বন, হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন দিয়ে। ভাতের গোটা গল্পটাই এই তিন মৌলের। বর্ষা জুড়ে ধানগাছ বাতাস থেকে CO2\mathrm{CO_{2}} আর কাদা থেকে পানি টেনে, রোদের শক্তিতে সেগুলো বুনে দিয়েছে দানায় দানায়। পরিপাক শুধু শিকলগুলো আবার খুলে দেয় গ্লুকোজে, আর কোষ সেই গ্লুকোজ পুড়িয়ে চলে। কাজেই থালার প্রধান পদটি আসলে কার্বনের মোড়কে গোছানো এক ঋতুর রোদই।

ডাল, শাক আর উদার কড়াই

ডাল মানে প্রোটিন — অ্যামিনো অ্যাসিডের শিকল, আর প্রতিটি অ্যামিনো অ্যাসিডেই নাইট্রোজেন — সঙ্গে মিলেছে বেশ খানিক লোহা। পালং শাকও আনে লোহা, তার সঙ্গে খানিক ক্যালসিয়াম। অস্থিমজ্জি সবসময় লোহা চায়, কারণ প্রতিটি নতুন লোহিত কণিকা তা নিয়েই হিমোগ্লোবিন গড়ে; আজ রাতের ডালের লোহা ক'সপ্তাহের মধ্যেই তোমার রক্তে বসবাস করবে, অক্সিজেন বয়ে আনবে-নেবে। আর রান্নাঘর নিজেও দান দেয়: ঢালু কড়াইয়ে টক কিছু রান্না করলে — টমেটো-তেঁতুলের ডাল, লেবু-দেওয়া শাক — অ্যাসিড পাত্র থেকে খানিকটা লোহা গলিয়ে নিয়ে আসে খাবারে। দাদির কড়াই আসলে সারাজীবন একটা খনিজ-সম্পূরকই ছিল।

পাশে রাখা কলা আনে পটাশিয়াম — স্নায়ুর সংকেত ছোড়া আর হৃদস্পন্দনের ছন্দ মেলা এই আয়নের কাজ। দুধ আর পাতাজাতীয় শাক জমায় হাড়ের ব্যাংকে ক্যালসিয়াম। আর যে ছোট মাছ বাঙালি কাঁটা-কাঁটাসুদ্ধ খায়, তাতেই মেলে থালার সেরা ক্যালসিয়ামের একাংশ। কোণে রাখা লেবুর ফালিটাও বৃথা নয় — ওর ভিটামিন সি শাক-ডালের লোহাকে দেহে শুষে নেওয়ার কাজে সাহায্য করে।

দুই কাজের নুন

নুন একমাত্র পাথর যা মানুষ খায়। সোডিয়াম চালায় স্নায়ুর বৈদ্যুতিক তারগুলো; আর ক্লোরাইড পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড বানানোর ফর্মুলার অর্ধেক জোগায় — যে অ্যাসিড খাবার গুলিয়ে হজমের কাজ চালায়। আর বাংলাদেশের নুনের আরেকটা কাজ আছে, নিঃশব্দের: কয়েক যুগ ধরে ওটা আয়োডিনযুক্ত, কারণ দিনে এক চিমটি আয়োডিন না পেলে থাইরয়েড — যে গ্রন্থি ঠিক করে দেয় শরীর কত দ্রুত শক্তি পোড়াবে — ফুলে ওঠে গলগণ্ড হয়। পাহাড় আর পলিমাটের জনপদে যে গলগণ্ড এক সময় ঘাড়ে ঘাড়ে লেগে থাকত, আয়োডিনযুক্ত নুনের যুগে জন্মানো বাচ্চাদের ঘাড়ে তা এখন বিরল।

কাল যখন থালা আবার সামনে আসবে, এক মুহূর্তের বাড়তি মনোযোগ দিও। বাঙালির রাতের খাওয়া শুধু খাওয়া নয় — উষ্ণ পরিবেশনায় সাজানো পর্যায় সারণি: ধানখেতের কার্বন-অক্সিজেন, ডালের নাইট্রোজেন, শাক আর কড়াইয়ের লোহা, নুনের শিশির সোডিয়াম। দিনে তিনবার রসায়ন তোমার টেবিলে বসে, আর খেতে দেয় মজা করে।

গল্পের মৌলগুলো

পড়া চালিয়ে যাও

তুমি তৈরি নক্ষত্রের ধুলোয়: তোমার শরীরের মৌলগুলোতোমার শরীরের ৯৬ শতাংশই মাত্র চারটি মৌল — অক্সিজেন, কার্বন, হাইড্রোজেন আর নাইট্রোজেন; আর মাত্র তিন গ্রাম লোহা প্রতিটি নিঃশ্বাসের অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যায় রক্তের স্রোতে।O · C · H · N · Caরান্নাঘরের পর্যায় সারণিদেশলাইয়ের বাক্স, কড়াই, রুপালি ফয়েল, ছুরি, তামার তলার পাত্র আর চুনার শিশি — রান্নাঘরে এক পাক ঘুরলেই হাতের নাগালে মিলবে অর্ধেক পর্যায় সারণি।Fe · Al · Cr · Cu · Fঅদৃশ্য মহাসাগর: প্রতিটি নিঃশ্বাসে যা আছেপ্রতিটি নিঃশ্বাস টানে এক কড়া রেসিপি: ৭৮ শতাংশ নাইট্রোজেন, ২১ শতাংশ অক্সিজেন, ১ শতাংশ আর্গন, আর জলবায়ু চালানোর মাত্র ০.০৪ শতাংশ CO2\mathrm{CO_{2}} — সঙ্গে খানিক জলীয় বাষ্প আর মাথার ওপরে ওজোনের পাতলা ঢাল।N · O · Ar · C · He