পরিষ্কার রাতে ছাদে উঠো, শহরের আলো যতদূর সেখান থেকেও ওপরে, আর যত তারা দেখা যায় গুনে চলো। যতই গুনো, একটা কথা মনে রেখো: ওদের প্রত্যেকেই — আর তোমার পায়ের নিচের ছাদটা, এমনকি যে চোখে তুমি গুনছ — শুরু হয়েছিল একটাই মৌল দিয়ে: হাইড্রোজেন। পর্যায় সারণির বাকি সবকিছু তৈরি হয়েছে পরে, চারখানা রান্নাঘরে — বিগ ব্যাং, নক্ষত্রের বুক, বিস্ফোরিত নক্ষত্র, আর মৃত নক্ষত্রের সংঘর্ষ। মহাবিশ্বের রসায়ন আসলে চার রান্নাঘরের গল্প।
প্রথম তিন মিনিট
১৩৮০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের শুরু কল্পনারও বাইরের গরম আর ঘনত্বে, তারপর বাড়তে বাড়তে ঠান্ডা হতে থাকল। বয়স যখন প্রায় তিন মিনিট, ততক্ষণে শেষ হয়ে গিয়েছিল মৌল-গড়ার প্রথম ও দ্রুততম পর্ব: সর্বত্র একক প্রোটন — হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস — আর ভরের হিসাবে প্রায় এক-চতুর্থাংশ জুড়ে জমা হিলিয়াম, সঙ্গে লিথিয়ামের সামান্য ছোঁয়া। তারপর চুল্লি নিভে গেল, অনেক যাবত নতুন কিছুই আর তৈরি হলো না। সেই প্রাচীন রেসিপি আজও রাজত্ব করে: এখনো মহাবিশ্বের সাধারণ বস্তুর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ হাইড্রোজেন, এক-চতুর্থাংশ হিলিয়াম। বাকি সব — সারণির প্রতিটি ঘর — দেরিতে আসা বিরল অতিথি।
নক্ষত্র: আসল রান্নাঘর
মহাকর্ষ হাইড্রোজেনকে জমিয়ে গড়ল প্রথম নক্ষত্রগুলো, আর কেন্দ্রে এমন চাপ দিল যে প্রোটনরা মিলেমিশে হিলিয়াম হয়ে গেল — অন্ধকারে আলো জ্বলে উঠল। আমাদের সূর্য আজও সেই একই বিক্রিয়া চালায়। কিন্তু বিশাল নক্ষত্ররা থামে না: হিলিয়াম গলে কার্বন, কার্বন গলে অক্সিজেন, এভাবে পেঁয়াজের মতো স্তরে স্তরে, শেষে কেন্দ্র হয়ে ওঠে লোহা। সেখানেই ব্যবসা ডুবে যায় — লোহা পর্যন্ত ফিউশন শক্তি দেয়, লোহার পরে শক্তি গিলে ফেলে। লোহার কেন্দ্র মানেই ইঞ্জিনের জ্বালানি শেষ: এক মুহূর্তের কিছু অংশেই কেন্দ্র ভেঙে পড়ে, আর নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয় সুপারনোভা হয়ে — ক'সপ্তাহ পর্যন্ত গোটা ছায়াপথের চেয়েও উজ্জ্বল জ্বলে — কার্বন, অক্সিজেন, ক্যালসিয়াম, লোহা ছড়িয়ে দেয় মহাশূন্যে, আর বিস্ফোরণের তাপে গড়ে লোহার চেয়েও ভারী নতুন মৌল।
সোনা কোথা থেকে আসে
সুপারনোভাতেও গল্প শেষ নয়। ২০১৭ সালে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ-তরঙ্গ শনাক্তকারীরা ধরল দুটি নিউট্রন তারা — মৃত সূর্যদের চূর্ণ অবশেষ — প্রায় ১৩ কোটি আলোকবর্ষ দূরে পরস্পরকে পেঁচিয়ে ধাক্কা খেতে। দূরবিনগুলো ঘুরে গেল, আর সংঘর্ষের আলোতে লেখা ছিল ভারী ধাতুর স্বাক্ষর: মহাবিশ্বের সোনা-প্লাটিনামের বড় ভাগটাই ঢালাই হয় এমন সংঘর্ষে। বিয়ের আংটির সোনাটুকু বোধহয় কোনো তারা-সংঘর্ষের ধ্বংসাবশেষ, যে ধাক্কা লেগেছিল সূর্যের জন্মেরও বহু আগে।
নক্ষত্রের উপাদান
আমাদের সৌরজগৎ জমাট বেঁধেছিল এমন এক মেঘ থেকে, যাতে আগেই মৃত নক্ষত্রদের ছাই মিশে গিয়েছিল — ওই উত্তরাধিকার না পেলে পৃথিবীর কেন্দ্রে লোহাও থাকত না, তোমার রক্তেও না, তাঁতীবাজারের গহনার দোকানে সোনাও না। কার্ল সেগান চার শব্দে বলে দিয়েছিলেন: we are made of star-stuff — আমরা নক্ষত্রের উপাদানে গড়া। তোমার গ্লাসের পানির হাইড্রোজেন বিগ ব্যাংয়ের আদি মাল, কোষের কার্বন এসেছে কোনো নক্ষত্রের চুল্লি থেকে, আর রক্তের লোহা ঢালাই হয়েছিল মৃত্যুর পথে হাঁটা এক দৈত্যের বুকে, পৌঁছেছে বিস্ফোরণের ডাকে।
কাজেই পরের পরিষ্কার রাতে ছাদে উঠে তারা গুনতে গিয়ে মনে রেখো — অচেনাদের দিকে তুমি তাকাচ্ছ না। তোমার হাইড্রোজেন ওদেরই সবার বড় ভাইবোন, বাকি তুমি ওদেরই ছাই আর উত্তরাধিকার। আকাশ তোমার মাথার ওপরে নয়, চারপাশে — পরিবার, আলো ধরে রেখেছে। উপরে তাকিয়ে একটা সালাম দিয়ে দাও।
